
আলমাস হোসাইন : অনুসন্ধানী প্রতিবেদন
আশুলিয়ায় আবারও ভুয়া কবিরাজের প্রতারণার শিকার এক নারী শ্রমিক। চিকিৎসার নামে অন্ধ বিশ্বাস ও সামাজিক মাধ্যমের বিভ্রান্তিকর বিজ্ঞাপনের জালে পড়ে হারিয়েছেন সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা। ভুক্তভোগী এখন দিশেহারা, আর প্রতারক কবিরাজ রয়েছেন পলাতক।
ফেসবুকের বিজ্ঞাপন, তারপর প্রতারণার জাল
ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার গজারিয়া গ্রামের রূপালী আক্তার (৩৬)। স্বামী বিদেশে, আর তিনি আশুলিয়ার বাইপাইল মন্ডলবাড়ী এলাকায় ভাড়া বাসায় থেকে স্থানীয় একটি তৈরি পোশাক কারখানায় কাজ করেন।
সম্প্রতি ফেসবুকে চিকিৎসা বিষয়ক একটি আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন চোখে পড়ে তাঁর। বিজ্ঞাপনে দাবি করা হয়—আধ্যাত্মিক চিকিৎসা ও তাবিজ-কবজে সমাধান’ করা হয় শতভাগ নিশ্চয়তায়। সেই বিজ্ঞাপনেই মোহিত হয়ে রূপালী যোগাযোগ করেন মো. আকবর আলী কবিরাজ নামে এক ব্যক্তির সঙ্গে।
ধাপে ধাপে হাতিয়ে নেয় সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা
প্রথমে নিজেকে ‘দ্বীনদার ও অভিজ্ঞ হেকিম’ পরিচয়ে আকবর আলী রূপালীর সঙ্গে ফোনে কথা বলেন। কিছুদিনের মধ্যে নানান অজুহাতে অর্থ দাবি শুরু করেন। কখনো চিকিৎসার সরঞ্জাম কেনা, কখনো বিশেষ দোয়া পাঠ, কখনো ‘অশুভ আত্মা তাড়ানো’র নাম করে তিনি বিকাশে টাকা নিতে থাকেন।
এইভাবে ধাপে ধাপে মোট ৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা পাঠিয়ে দেন রূপালী আক্তার।
রূপালী বলেন,
প্রথমে খুব ভদ্রভাবে কথা বলত। বিশ্বাস করেছিলাম। পরে একের পর এক টাকা চাইতে থাকে। আমি সন্দেহ প্রকাশ করলে ভয় দেখায়, বলে—‘দোয়া মাঝপথে থেমে গেলে সর্বনাশ হবে’। তখন ভয় পেয়ে টাকা পাঠিয়ে দেই।
শেষ দাবি আর ভয়ংকর হুমকি
রূপালীর অভিযোগ, ২৪ অক্টোবর বিকেলে আকবর আলী আবারও ফোন করে আরও ৫০ হাজার টাকা দাবি করেন। টাকা দিতে অস্বীকার করলে অশালীন ভাষায় গালাগালি ও প্রাণনাশের হুমকি দেন তিনি। তখনই বিষয়টির প্রতারণা বুঝে তিনি আশুলিয়া থানায় লিখিত অভিযোগ করেন।
অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, আকবর আলীর ঠিকানা অজ্ঞাত হলেও তাঁর ব্যবহৃত মোবাইল নম্বর দুটি হলো
০১৩০০২০৩৬০৩ ও ০১৭৪৮৮৯১৪৫৮।
পুলিশ বলছে, তদন্ত চলছে
আশুলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জানান,
অভিযোগ পেয়েছি। প্রাথমিকভাবে এটি স্পষ্ট প্রতারণার ঘটনা। আমরা বিষয়টি তদন্ত করছি। অভিযুক্তের অবস্থান শনাক্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ফেসবুকে ছড়ানো ভুয়া কবিরাজি বিজ্ঞাপন
সামাজিক মাধ্যমে প্রতারণার এমন ঘটনা নতুন নয়। প্রতিদিনই বিশেষ চিকিৎসা দোয়া-মন্ত্রে রোগমুক্তি, ঘরোয়া চিকিৎসা ইত্যাদি নামে শত শত বিজ্ঞাপন ছড়িয়ে পড়ছে ফেসবুকে। এসব বিজ্ঞাপনের অধিকাংশেরই কোনো বাস্তব চিকিৎসাগত ভিত্তি নেই।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অশিক্ষা ও কুসংস্কারের সুযোগ নিয়ে এসব প্রতারক গোষ্ঠী সাধারণ মানুষকে ফাঁদে ফেলছে।
সতর্কবার্তা
সাইবার ক্রাইম ইউনিটের কর্মকর্তারা সাধারণ মানুষকে সতর্ক করে বলেছেন
কোনো ধরনের চিকিৎসা বা তাবিজ–কবজের জন্য সামাজিক মাধ্যমে লেনদেন করবেন না। সন্দেহজনক হলে সঙ্গে সঙ্গে থানায় বা সাইবার হেল্পলাইনে যোগাযোগ করুন।
উপসংহার
একজন পরিশ্রমী নারী শ্রমিকের ঘামের টাকায় সঞ্চিত সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা এখন প্রতারণার শিকার হয়ে গায়েব। ভুয়া কবিরাজ আকবর আলী কোথায়, সেটি এখন পুলিশের তদন্তে। তবে প্রশ্ন থেকে যায়
ফেসবুকের এমন প্রতারক বিজ্ঞাপন আর কত মানুষকে নিঃস্ব করবে?
আর কত রূপালী হারাবেন নিজের পরিশ্রমের মূল্য?