
বিশেষ প্রতিনিধি:
কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রামের ঐতিহাসিক হাবেলি বাড়িতে অত্যন্ত ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ পরিবেশে পবিত্র আশুরা ও মহররম উপলক্ষে ১৯১তম ২২ মৌজার 'পাঁচ গায়েলা সভা' অনুষ্ঠিত হয়েছে। প্রতি বছরের ন্যায় মহররমের ৫ তারিখে ঐতিহ্যবাহী হাবেলি বাড়িতে এই সভার আয়োজন করা হয়। সকাল ১০টায় শুরু হয়ে দুপুর ১টায় সভাটি সমাপ্ত হয়।
এতে সভাপতিত্ব করেন হাবেলি বাড়ির সন্তান সৈয়দ আহমেদুল কবির প্রিন্স। সভাটি সঞ্চালনা করেন অষ্টগ্রাম সদর ইউপি চেয়ারম্যান, উপজেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক ও হাবেলি বাড়ির সন্তান সৈয়দ ফাইয়াজ হাসান বাবু।
সভায় বিশ্বমানবতার কল্যাণ কামনা করে মোনাজাত পরিচালনা করেন মধ্য অষ্টগ্রাম সাহেব বাড়ির পীরজাদা সৈয়দ মেজবাহুল হোসাইন (শাহজাদা মিয়া)। সভায় অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন— মধ্য অষ্টগ্রাম তাজিয়া কমিটির সভাপতি জিএম সেলিম, আহসান হাবিব, উপজেলা বিএনপির সহ-সভাপতি জাকির হোসেন সফি, মোঃ আনাস আলী মেম্বার, নূর ইসলাম মেম্বার ও আঃ রহিম কাস্তুল, হাজী অদু মিয়া প্রমুখ।
ঐতিহাসিক এই পাঁচ গায়েলা সভায় অষ্টগ্রাম সদর, দেওঘর, কাস্তুল, বাঙ্গালপাড়া ও পূর্ব অষ্টগ্রাম— এই পাঁচ ইউনিয়নের ২৫টি হোসাইনী মোকামের প্রতিনিধিসহ এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
সভায় সর্বসম্মতিক্রমে মহররমের মূল আনুষ্ঠানিকতার সময়সূচি নির্ধারণ করা হয়। আগামী ২৫ জুন (৯ই মহররম) দুপুর ১২টা ১ মিনিটে নিশান গাস্ত (চক্কর) এবং রাত ১২টা ১ মিনিটে তাজিয়া গাস্ত অনুষ্ঠিত হবে। ২৬ জুন (১০ই মহররম) বিকেল ৪টায় মধ্য অষ্টগ্রাম স্থানীয় কারবালার উদ্দেশ্যে তাজিয়া নিয়ে রওয়ানা করা হবে এবং সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে ১০ দিনব্যাপী মহররমের যাবতীয় আনুষ্ঠানিকতার সমাপ্তি ঘটবে।
অষ্টগ্রামের মহররমের এই দীর্ঘদিনের রেওয়াজ নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে সভায় বক্তারা উল্লেখ করেন, অষ্টগ্রামে শিয়া মাজহাবের কোনো লোক নেই; এখানকার সকল অধিবাসীই আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের অনুসারী। মহররমের চাঁদ ওঠার পর থেকেই স্থানীয় ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা ১০ দিন রোজা রাখেন। ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সকলের প্রিয় খাবার মাছ হওয়া সত্ত্বেও, ইমাম হোসাইন (রাঃ)-এর প্রতি ভালোবাসার নিদর্শনে এই দিনগুলোতে তারা প্রিয় খাবার বর্জন করে সাধারণ মানের খাবার গ্রহণ করেন।
এছাড়া সাধারণ পোশাক পরিধান, খালি মাথায় ও খালি পায়ে চলাচল এবং খাট-পালং ছেড়ে মাটিতে শয়নের মাধ্যমে তারা শোক ও সংযম প্রকাশ করেন। পাশাপাশি প্রতিদিন হোসাইনী মোকামে মাতম, জারি ও মার্সিয়া পরিবেশন এবং মাগরিবে ফাতেহা পাঠ, তাবারক বিতরণ ও ইফতারের আয়োজন করা হয়।
সভায় সদর ইউপি চেয়ারম্যান সৈয়দ ফাইয়াজ হাসান বাবু বলেন, "আমরা আল্লাহর একত্ববাদের পাশাপাশি নবী মুহাম্মদ (সাঃ)-কে খাতামুন্নাবিয়্যীন মানি এবং খেলাফতে বিশ্বাস করি। গাউসে পাক বড়পীর আব্দুল কাদের জিলানী (রাঃ) সহ অলি-আল্লাহগণকে আমরা অত্যন্ত শ্রদ্ধার সাথে ভালোবাসি। সাহাবায়ে কেরাম ও উম্মাহাতুল মুমিনীন আমাদের মাথার তাজ। আমরা নবী (সাঃ) ও আলে নবীগণকে নিজেদের পিতা-মাতা, সন্তান-সন্ততি, ধন-দৌলত এবং নিজের জীবনের চেয়েও বেশি মহব্বত করি।
তিনি আরও বলেন, "আমরা এই নিয়মগুলো কেবল বাপ-দাদার আমল থেকে চলে আসছে বলে করছি না; আমাদের পূর্বপুরুষেরা হাদীস, কোরআন, ইজমা ও কিয়াসের দলিল ভিত্তিক সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন বলেই আমরা তা অনুসরণ করছি। ইমাম হোসাইনের শাগাদত স্বরবনে শোকানুষ্ঠান কিয়ামত পর্যন্ত জারি থাকবে বলে আমরা বিশ্বাস করি। নবী ও আলে নবী (সাঃ)-এর আদর্শকে ধারণ করে আমল করলেই তা পরকালে কাজে আসবে। কেননা, সকল ইবাদত কবুলের মাধ্যমই হলো নবী ও আলে নবী (সাঃ)-এর ওপর দুরুদ পাঠ করা। রাসুলুল্লাহ সাঃ তো বলেছেন যার সাথে যার ভালবাসা তার সাথেই তার হাশর। আল্লাহ পাক আমাদের সকলকে হোসাইনী আদর্শে আদর্শবান এবং কারবালার চেতনায় উজ্জীবিত করুন।
সভা শেষে ইউনুস আলী মেম্বারসহ এলাকার অসুস্থ ব্যক্তিদের রোগমুক্তি এবং বিশ্ব মানবতার কল্যাণ ও শান্তি কামনা করে বিশেষ দোয়া ও মোনাজাতের মাধ্যমে সভার সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়।
সম্পাদক ও প্রকাশক : সুমন আহমেদ, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: বাইপাইল মোড়া আশুলিয়া সাভার। মোবাইল:
দৈনিক বাংলাদেশ ক্রাইম