
কামরুল ইসলাম, রাঙ্গুনিয়া প্রতিনিধি:
চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার ওপর দিয়ে বয়ে চলা ঐতিহ্যবাহী ইছামতী নদী দিন দিন ময়লা-আবর্জনা ও বর্জ্যের ভাগাড়ে পরিণত হচ্ছে। বছরের পর বছর সংস্কারের অভাব, নদী ও খালের পাড়ে বর্জ্য ফেলা এবং দখলের কারণে নদীটি তার স্বাভাবিক রূপ ও নাব্যতা হারাচ্ছে। এতে পরিবেশের ভারসাম্য যেমন হুমকির মুখে পড়েছে, তেমনি সংকুচিত হয়ে পড়ছে নদীর প্রবাহপথ।
ইছামতী বাংলাদেশের পূর্ব-পাহাড়ি অঞ্চলের রাঙ্গামাটি ও চট্টগ্রাম জেলার একটি নদী। প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এ নদীর গড় প্রস্থ প্রায় ৩০ মিটার। রাঙ্গামাটি জেলার কাউখালী উপজেলার ঘাগড়া ইউনিয়নের পাহাড়ি এলাকা থেকে উৎপত্তি হয়ে নদীটি চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার মরিয়মনগর ইউনিয়ন পর্যন্ত প্রবাহিত হয়ে কর্ণফুলী নদীতে গিয়ে মিলিত হয়েছে।
রাঙ্গুনিয়া পৌরসভা থেকে রাজানগর, পারুয়া, হোসনাবাদ ও স্বনির্ভর রাঙ্গুনিয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার সময় বেশ কয়েকটি ছোট খাল ও ছড়া ইছামতীর সঙ্গে মিলিত হয়েছে। মৌসুমি প্রকৃতির এ নদীতে সারা বছর সমান পানিপ্রবাহ না থাকলেও বর্ষাকালে পাহাড়ি ঢলের কারণে পানির প্রবাহ বেড়ে যায়। তখন নদীর পানি উপচে আশপাশের বিভিন্ন এলাকা প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নদীর পাড় ও আশপাশের খালগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ধরনের ময়লা-আবর্জনা ও বর্জ্য ফেলা হচ্ছে। বিশেষ করে কাপ্তাই সড়কের পাশের খাল ভরাট করে বর্জ্য ফেলার কারণে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। প্লাস্টিক ও অপচনশীল বর্জ্য নদীতে গিয়ে পড়ায় দূষণ আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করছে।
একসময় ইছামতী নদীকে ঘিরেই রাঙ্গুনিয়ার ঐতিহ্যবাহী রাণীরহাট, রাজারহাট ও রোয়াজারহাট বাজারসহ বিভিন্ন জনপদ গড়ে উঠেছিল। নদীর নাব্যতা কমে যাওয়া ও পরিবেশগত বিপর্যয়ের কারণে সেই ঐতিহ্য এখন অনেকটাই ম্লান হয়ে পড়েছে।
নদীর বিভিন্ন অংশে পলি ও বর্জ্য জমে ভরাট হয়ে যাওয়ায় স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে। একই সঙ্গে নদীর দুই তীরের বিভিন্ন অংশ দখল হয়ে নদীর গতিপথও সংকুচিত হচ্ছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। এভাবে চলতে থাকলে ইছামতী একসময় অস্তিত্ব সংকটে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন পরিবেশ সচেতন মহল।
রাঙ্গুনিয়ার সদ্য যোগদান করা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও রাঙ্গুনিয়া পৌরসভার প্রশাসক খন্দকার ফারজানা নাজনীন সেতু বলেন, “আমি সদ্য রাঙ্গুনিয়ার দায়িত্বে এসেছি। বিষয়টি সম্পর্কে এখনো অবগত নই। আপনি যেহেতু বিষয়টি জানিয়েছেন, আমি গুরুত্বের সঙ্গে দেখব এবং যথাযথ ব্যবস্থা নেব।”
পরিবেশবাদী সংগঠন গ্রীন ফর সোসাইটি-এর সভাপতি নেজাম উদ্দীন বলেন, “বর্জ্য ও প্লাস্টিক নদীর জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। এটি পরিবেশের ভারসাম্য নষ্টের অন্যতম কারণ। আমরা এর আগেও রাঙ্গুনিয়ার ইউএনওকে স্মারকলিপি দিয়েছি। তখন দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। আশা করি বর্তমান ইউএনও ইছামতী নদী ও এর সঙ্গে সংযুক্ত খালগুলো রক্ষায় দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেবেন।”
স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবেশকর্মীরা ইছামতী নদী রক্ষায় দ্রুত বর্জ্য ফেলা বন্ধ, দখল উচ্ছেদ, নদী ও খাল পুনঃখনন এবং নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালনার দাবি জানিয়েছেন। পাশাপাশি নদী রক্ষায় প্রশাসনের কঠোর নজরদারি ও জনসচেতনতা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন তারা।
ইছামতীকে বাঁচাতে এখনই কার্যকর উদ্যোগ না নিলে এই ঐতিহ্যবাহী নদীটি ক্রমেই হারিয়ে যেতে পারে—এমন আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের।
সম্পাদক ও প্রকাশক : সুমন আহমেদ, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: বাইপাইল মোড়া আশুলিয়া সাভার। মোবাইল:
দৈনিক বাংলাদেশ ক্রাইম