আলমাস হোসাইন | ঢাকা জেলা প্রতিনিধি
সাভারে বায়ু দূষণ নিয়ন্ত্রণে সরকারিভাবে ‘ডিগ্রেডেড এয়ারশেড’ ঘোষণা থাকলেও বাস্তবে তার কোনো কার্যকর প্রতিফলন নেই। অবৈধ ইটভাটার কালো ধোঁয়ায় দিন দিন বিপন্ন হয়ে উঠছে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য।
পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, সাভারের বার্ষিক বায়ুমান জাতীয় মানের তুলনায় প্রায় তিন গুণ বেশি দূষিত। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক এ কে এম রাশিদুল আলম বলেন, এখানকার এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স (AQI) স্বাভাবিক মাত্রার দ্বিগুণেরও বেশি। অবৈধ ইটভাটায় কয়লা পোড়ানোর ফলে নির্গত সালফার ডাই-অক্সাইড ও সূক্ষ্ম ক্ষতিকর কণিকা ফুসফুসের রোগ ও ক্যানসারের ঝুঁকি মারাত্মকভাবে বাড়িয়ে দিচ্ছে।
ঢাকার পার্শ্ববর্তী সাভার উপজেলাকে গত বছর ‘ডিগ্রেডেড এয়ারশেড’ ঘোষণা করে পরিবেশ অধিদপ্তর। এর আওতায় ইটভাটা বন্ধে বিশেষ অভিযান শুরু হলেও তা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। অভিযানের পর কিছু ভাটা বন্ধ হলেও অল্প সময়ের মধ্যেই অধিকাংশ আবার চালু হয়ে যায়।
গত ৫ নভেম্বর আশুলিয়ার শিমুলিয়া এলাকায় পরিবেশ অধিদপ্তরের অভিযানে কয়েকটি ইটভাটার চুল্লি ভেঙে দেওয়া হয়। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, মাত্র দুই মাসের মধ্যেই সেখানে নতুন করে চুল্লি তৈরি করে আবার ইট উৎপাদন শুরু হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা নিজাম উদ্দিন বলেন, “ভাটা ভাঙার পর ভেবেছিলাম সমস্যা শেষ। কিন্তু এখন আবার ধোঁয়া উঠছে। কীভাবে ও কার অনুমতিতে চালু হলো—তা কেউ জানে না।
আরেক বাসিন্দা শাওন বলেন, পরিবেশ সংরক্ষণ আইনে সাধারণ মানুষের মামলা করার স্পষ্ট অধিকার নেই, যা বড় একটি দুর্বলতা। তিনি বলেন, পরিবেশগত ক্ষতির শিকার হলেও সাধারণ নাগরিকের আদালতে যাওয়ার সুযোগ থাকা উচিত। এজন্য আইন সংশোধনের দাবি জানান তিনি।
ইটভাটার আগুনের তাপ ও ছাইয়ের প্রভাবে আশপাশের ফসলি জমির উর্বরতা কমে যাচ্ছে। জ্বালানি হিসেবে কাঠ ব্যবহারে সামাজিক বনও উজাড় হচ্ছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রাজিব রায়হান বলেন, “ইটভাটার ধোঁয়ায় নিঃশ্বাস নেওয়াই কষ্টকর হয়ে গেছে। শিশু ও বৃদ্ধদের মধ্যে শ্বাসকষ্ট ও নিউমোনিয়া বেড়েই চলছে। ফসল ও বন—সবকিছুই ধ্বংসের মুখে।”
পরিবেশ অধিদপ্তরের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রেজওয়ান-উল-ইসলাম বলেন, নিয়মিত নজরদারি চলছে। অনেক ভাটা ম্যানুয়ালি পরিচালিত হওয়ায় তারা দ্রুত আবার চালু হয়ে যায়। যারা পুনরায় চিমনি নির্মাণ করবে, তাদের বিরুদ্ধে এবার অতিরিক্ত মামলা ও প্রয়োজন হলে গ্রেপ্তারের ব্যবস্থাও নেওয়া হবে।
সাভার উপজেলায় প্রায় ১০৭টি ইটভাটার মধ্যে মাত্র দুটি পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিতে পরিচালিত হচ্ছে। সচেতন নাগরিকদের মতে, লোকদেখানো অভিযান নয়—অবৈধ ইটভাটা স্থায়ীভাবে বন্ধে কঠোর রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও নিয়মিত নজরদারি জরুরি। অন্যথায় সাভারের বিষাক্ত বাতাস ঢাকার বায়ুমানকেও দীর্ঘমেয়াদে ভয়াবহ সংকটে ফেলবে।
সম্পাদক ও প্রকাশক : আলমাস হোসাইন, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: খান টাওয়ার নিচতলা বাইপাইল মোড়া আশুলিয়া সাভার। মোবাইল: ০১৭৭৫০৮০৬২০
দৈনিক বাংলাদেশ ক্রাইম