
মোঃ আল-আমিন, বিশেষ প্রতিনিধি:
কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম উপজেলায় যথাযোগ্য ধর্মীয় মর্যাদা, শোকাবহ পরিবেশ ও ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে পালিত হয়েছে পবিত্র আশুরা। শুক্রবার (১০ মহররম) দিনব্যাপী নফল রোজা, নামাজ, জিকির-আসকার, দোয়া, দান-সদকা এবং বিভিন্ন ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দিনটি পালন করেন ধর্মপ্রাণ মুসল্লিরা।
ইসলামের ইতিহাসে আশুরা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি দিন। আরবি 'আশারা' শব্দের অর্থ দশ এবং 'আশুরা' অর্থ দশম। হিজরি ৬১ সালের ১০ মহররম কারবালার ময়দানে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর দৌহিত্র হজরত ইমাম হোসেন (রা.) ও তাঁর পরিবার-পরিজন এবং সঙ্গীরা সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে শাহাদত বরণ করেন। তাঁদের এই আত্মত্যাগ আজও মানবতার জন্য অনন্য প্রেরণা হয়ে রয়েছে।
এ উপলক্ষে ৩ নম্বর অষ্টগ্রাম সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সৈয়দ ফাইয়াজ হাসান বাবু জানান, হযরত শাহজালাল ইয়ামেনী (রহ.)-এর অন্যতম প্রধান সহচর সিপাহসালার সৈয়দ নাসির উদ্দিন (রহ.)-এর বংশধর এবং 'ভাটির অলী' হিসেবে পরিচিত হযরত সৈয়দ আবদুল করিম আল-হোসাইনী (রহ.), ওরফে সৈয়দ আলাই মিয়া সাহেব, আহলে বাইতের প্রতি গভীর ভালোবাসা থেকে অষ্টগ্রামে মহররমের এই ঐতিহ্যের সূচনা করেন।
তিনি বলেন, পার্থিব ভোগ-বিলাস ও 'নয় কোষা' জমিদারি ত্যাগ করে সৈয়দ আলাই মিয়া সাহেব অত্যন্ত সাধারণ জীবনযাপন করতেন। ১৮৩৪ সালে তিনি নিজ বাড়িতে একটি হোসাইনী মোকাম (ইমামবাড়া) প্রতিষ্ঠা করেন এবং ১৮৩৫ সাল থেকে মহররমের আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি শুরু হয়। সেই ধারাবাহিকতায় টানা ১৯১ বছর ধরে বংশপরম্পরায় এই ঐতিহ্য অক্ষুণ্ণ রয়েছে।
তিনি আরও জানান, মহররমের চাঁদ দেখা যাওয়ার পর থেকেই বিশেষ নিয়ম মেনে কর্মসূচি শুরু হয়। মোকামে লাল ও কালো নিশান উত্তোলন, টানা ১০ দিন রোজা পালন, মাটিতে শয়ন, সাধারণ পোশাক পরিধান, নিরামিষ ও সাধারণ খাবার গ্রহণ এবং খালি মাথা ও খালি পায়ে চলাফেরা ছিল সৈয়দ আলাই মিয়া সাহেবের অনুসৃত নিয়ম।
প্রতিদিন ফজরের নামাজের পর মিলাদ শরিফ, কারবালার ইতিহাস আলোচনা ও জারি গান পরিবেশিত হয়। সকালবেলায় নারীরাও আলাদাভাবে জারি পরিবেশন করেন। একই সঙ্গে পুরুষরা বাঁশ, বেত, রঙিন কাগজ ও কাপড় দিয়ে কারবালার স্মৃতিবিজড়িত তাজিয়া নির্মাণে অংশ নেন। আসরের পর মাতম ও মার্সিয়া, মাগরিবের আগে ফাতেহা এবং ইফতারের জন্য তাবারক বিতরণের মধ্য দিয়ে প্রতিদিনের আয়োজন শেষ হয়।
মহররমের কর্মসূচির অংশ হিসেবে ৫ মহররমে 'পাঁচ গায়েলা' নামে ২২ মৌজার মাতাব্বর ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নিয়ে বিশেষ সভা অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়া ৯ মহররমে নিশান গাস্ত ও তাজিয়া গাস্তের মাধ্যমে ১০ মহররমের সার্বিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়।
আশুরার দিন বিকেলে উপজেলার বিভিন্ন মোকাম থেকে তাজিয়া মিছিল বের হয়ে মধ্য অষ্টগ্রামের কারবালা প্রাঙ্গণে একত্রিত হয়। সেখানে তাজিয়া স্থাপনের মাধ্যমে ১০ দিনের শোকানুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটে। প্রতিবছরের মতো এবারও বিপুলসংখ্যক মানুষ এতে অংশ নেন। অনেক সনাতন ধর্মাবলম্বীকেও শোকানুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করতে দেখা যায়, যা অষ্টগ্রামের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
সৈয়দ ফাইয়াজ হাসান বাবু বলেন, সৈয়দ আলাই মিয়া সাহেবের ইন্তেকালের পর পর্যায়ক্রমে হযরত মাওলানা সৈয়দ আবদুল হেকীম আল-হোসাইনী (রহ.) এবং মাওলানা সৈয়দ কুতুব উদ্দিন আহমেদ আল-হোসাইনী চিশতী (রহ.) এই ঐতিহ্য রক্ষা করেন। বর্তমানে সৈয়দ আহমেদুল কবির প্রিন্স নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন। এ আয়োজন সফল করতে হাবেলির সদস্য, স্থানীয় বাসিন্দা এবং ২২ মৌজার গণ্যমান্য ব্যক্তিরা সার্বিক সহযোগিতা করে আসছেন।
তিনি আরও বলেন, পবিত্র আশুরা মুসলমানদের কাছে শুধু শোকের দিন নয়; এটি সত্য, ন্যায়, ত্যাগ, ধৈর্য, সহমর্মিতা ও মানবকল্যাণের শিক্ষায় অনুপ্রাণিত হওয়ারও দিন। কারবালার আত্মত্যাগ অন্যায় ও জুলুমের বিরুদ্ধে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর এবং ন্যায়ের পথে অবিচল থাকার শিক্ষা দেয়, যা যুগে যুগে মানুষের জন্য প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।
সম্পাদক ও প্রকাশক : সুমন আহমেদ, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: বাইপাইল মোড়া আশুলিয়া সাভার। মোবাইল:
দৈনিক বাংলাদেশ ক্রাইম