
বাগেরহাট প্রতিনিধি:
বাগেরহাট জেলা ও দায়রা জজ আদালতের তিনতলা ভবনের পলেস্তারা খসে পাঁচ বিচারপ্রার্থী আহত হয়েছেন, যা পুরোনো ও ঝুঁকিপূর্ণ অবকাঠামোর ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছে।
১৩ জুলাই সোমবার দুপুরে বাগেরহাট জেলা ও দায়রা জজ আদালতের তিনতলা ভবনের নিচতলায় কচুয়া আদালতের এজলাসসংলগ্ন বারান্দায় ছাদের পলেস্তারা খসে পড়ার মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। বিচারিক কার্যক্রম চলাকালীন হঠাৎ ওপর থেকে পলেস্তরার বড় একটি অংশ নিচে অবস্থানরত বিচারপ্রার্থীদের ওপর আছড়ে পড়লে ঘটনাস্থলেই সুমন দাস, হৃদয় হাওলাদার, হাবিবুল্লাহ শেখ, মো. ফিরোজ শেখ এবং মোতালেব হোসেন গুরুতর আহত হন। ঘটনার আকস্মিকতায় আদালত চত্বরে উপস্থিত সাধারণ মানুষ ও আইনজীবীদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং তাৎক্ষণিকভাবে বিচারিক কার্যক্রম সাময়িক বিঘ্নিত হয়। দায়িত্বরতরা দ্রুত আহতদের উদ্ধার করে বাগেরহাট ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেলা হাসপাতালে প্রেরণ করেন, যেখানে বর্তমানে তারা চিকিৎসাধীন রয়েছেন। বিচারপ্রার্থীদের ওপর ঘটে যাওয়া এই অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা বিচার বিভাগের নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনার ওপর এক বড় প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দিয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও ভুক্তভোগীদের অভিযোগ অনুযায়ী, দীর্ঘ সময় ধরে ভবনটির রক্ষণাবেক্ষণ না করায় ছাদের বিভিন্ন স্থানে বড় ধরনের ফাটল দেখা দিয়েছিল। আহত বিচারপ্রার্থী মো. ফিরোজ শেখসহ অন্যরা জানান, এজলাসসংলগ্ন বারান্দাটি সবসময় জনাকীর্ণ থাকে, অথচ ভবনের জরাজীর্ণ অবস্থা সম্পর্কে অবগত থাকা সত্ত্বেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কোনো কার্যকর সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার ডা. শেখ আদনান হোসেন জানিয়েছেন, আহতদের মাথায়, ঘাড়ে ও পায়ে আঘাত লেগেছে, যা নির্দেশ করে পলেস্তারাটি বেশ ভারী ছিল। ভুক্তভোগীদের দাবি, ন্যায়বিচার পাওয়ার আশায় আদালতে এসে অবকাঠামোগত ত্রুটির কারণে শারীরিক ক্ষতির শিকার হওয়া কোনোভাবেই কাম্য নয়। এই ঘটনার পর থেকেই আদালত প্রাঙ্গণে আগত বিচারপ্রার্থীদের মধ্যে চরম নিরাপত্তাহীনতা কাজ করছে, কারণ ভবনটির অন্যান্য অংশও যেকোনো মুহূর্তে ধসে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বাগেরহাট জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর এম এম মাহাবুব মোর্শেদ লালন জানিয়েছেন, ভবনটি অত্যন্ত পুরোনো এবং এর স্থাপত্য কাঠামো বর্তমানে ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
তিনি জানান, ঘটনার পরপরই বিচারকরা হাসপাতালে গিয়ে আহতদের শারীরিক অবস্থার খোঁজখবর নিয়েছেন এবং দ্রুত প্রয়োজনীয় চিকিৎসার নির্দেশনা দিয়েছেন। এদিকে, গণপূর্ত অধিদপ্তরের গাফিলতির দিকে ইঙ্গিত করে তিনি জানান, ঝুঁকিপূর্ণ অংশগুলো সংস্কারের জন্য এর আগেও একাধিকবার তাগাদা দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের অভাবে আজ এই দুর্ঘটনা ঘটল। বর্তমানে বিচারক ও আইনজীবীরা অবিলম্বে ভবনটি পরিত্যক্ত ঘোষণা অথবা জরুরি ভিত্তিতে বড় ধরনের মেরামতের দাবি জানিয়েছেন, যাতে ভবিষ্যতে কোনো প্রাণহানির মতো ঘটনা না ঘটে।
পরিশেষে, বাগেরহাটের এই ঘটনা কেবল একটি বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা নয়, বরং দেশের পুরোনো সরকারি ভবনগুলোর ভঙ্গুর দশার একটি জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত। বিচারপ্রার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যেখানে রাষ্ট্রের প্রাথমিক দায়িত্ব, সেখানে আদালতের মতো গুরুত্বপূর্ণ ভবনে এমন ধস বিচারিক কার্যক্রমের ওপর আস্থা ও নিরাপত্তার সংকট তৈরি করে। দ্রুত সংস্কার কাজ শুরু না করলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের মানবিক বিপর্যয় ঘটার সম্ভাবনা প্রবল।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যদি অবিলম্বে এই ঝুঁকিপূর্ণ ভবনটি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ না করে, তবে বিচারপ্রার্থীদের আদালতে আসার পরিবেশ ও নিরাপত্তা উভয়ই অনিশ্চয়তার মুখে পড়বে, যা সামগ্রিক বিচার ব্যবস্থার জন্য একটি অশনিসংকেত হিসেবে বিবেচিত হবে।
সম্পাদক ও প্রকাশক : সুমন আহমেদ, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: বাইপাইল মোড়া আশুলিয়া সাভার। মোবাইল:
দৈনিক বাংলাদেশ ক্রাইম