
চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ায় কর্যক্রম নিষিদ্ধ ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ নেতা আবু জাফরকে জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন ও ভুল তথ্য উপস্থাপন করে উপজেলার বেতাগী ইউনিয়নের কাউখালি আনোয়ারা বেগম উচ্চ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব দেয়ার অভিযোগ উঠেছে। এনিয়ে শিক্ষক কর্মচারীদের মধ্যে চরম অসন্তোষ বিরাজ করছে।
জানা গেছে, চলতি বছর ১১ মার্চ রাঙ্গুনিয়া উপজেলার কাউখালি আনোয়ারা বেগম উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আইয়ুব মাস্টার অবসর গ্রহণ করেন। সরকারি পরিপত্র অনুযায়ী প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য হলে কিংবা প্রধান শিক্ষক কোনও কারণে অনুপস্থিত থাকলে সেক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের সহকারী প্রধান শিক্ষক দায়িত্ব পালন করবেন। এক্ষেত্রে প্রধান শিক্ষকের অনুপস্থিতিতে তার দায়িত্বভার পালন সম্পর্কিত শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সরকারি পরিপত্রে (স্মারক নং: শিম/শা:১১/৩-৯/২০১১/২৫৬) বলা হয়েছে, বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক থাকা অবস্থায় তাকে ছাড়া অপর কোনও শিক্ষককে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের দায়িত্বভার অর্পণ করা যাবে না।
পরিপত্রে আরও বলা হয়েছে, কোনও বিদ্যালয়ে সহকারী প্রধান শিক্ষক না থাকলে জ্যেষ্ঠতম সহকারী শিক্ষক প্রধান শিক্ষকের দায়িত্বভার পালন করবেন। অথচ জ্যেষ্ঠ শিক্ষক মুছা কালিমিল্লাহ থাকার পরও ম্যানেজিং কমিটি সরকারি পরিপত্রের তোয়াক্কা না করে দ্বিতীয় কনিষ্ঠ সহকারী শিক্ষক আবু জাফর মাস্টারকে বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব অর্পণ করেছেন। এনিয়ে জ্যেষ্ঠতম শিক্ষক মুছা কলিমুল্লাহ প্রথমে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবর ও পরে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরে লিখিত অভিযোগ করেন।
এদিকে ভারপ্রাপ্ত ওই প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে স্বেচ্ছাচারিতা ও এক শিক্ষকের কাছ থেকে পদত্যাগ করেছেন মর্মে জোরপূর্বক স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নেয়ার অভিযোগে চট্টগ্রাম সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা করেছেন (মামলা নং ৫৩৬/২০২৫) স্কুলের সহকারী প্রধান শিক্ষক মাস্টার আবুল হোসেন। সে মামলায় ৪২০/৩৮৬ ধারায় অপরাধ প্রমানিত হওয়ায় আদালতে আত্মসমর্পণও করেন আবু জাফর মাস্টার। উক্ত মামলায় সদ্যবিদায়ী প্রধান শিক্ষক আইয়ুব মাস্টারকে চাকরিরত অবস্থায় জেল-হাজতে যেতে হয়েছে। এবং বর্তমান ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আবু জাফর ও অন্য এক শিক্ষক জামিনে আছেন।
এছাড়াও বিদ্যালয়ের একজন প্রভাবশালী দাতাকে নিয়েও রয়েছে গুরুতর জালিয়াতির অভিযোগ। স্থানীয় ব্যক্তি না হওয়া সত্ত্বেও বিদ্যালয়ের পাশ্ববর্তী ভূমিহীন কৃষকের রেজিষ্ট্রেশন প্রদানে অযোগ্য জায়গা জোরপূর্বক দখল করে ২০১৩ সালে দাতা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেন। যদিওবা শিক্ষা বোর্ডের প্রবিধান অনুসারে প্রতিষ্ঠার পর কিংবা অন্যের জমি দখল করে এ ধরনের দাতা হওয়ার সুযোগ নেই। তারপরও সরকারের সর্বশেষ পরিপত্রের নির্দেশনা উপেক্ষা করে চাপের মুখে উক্ত বিতর্কিত উক্ত দাতাকে এডহক কমিটির সভাপতি মনোনয়নের প্রস্তাব করা হয়েছে। তাছাড়াও অভিযোগ রয়েছে, পূর্বেকার সভাপতি পরিচালনা কমিটির কোন সভা বিদ্যালয় অঙ্গণে অনুষ্ঠিত না হওয়ারও। এনিয়ে দীর্ঘদিন ধরে একাধিক মামলা বিচারধীন রয়েছে।
প্রচার আছে যে, ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আবু জাফর মাস্টার পতিত স্বৈরসরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদের অত্যন্ত আস্থাভাজন ছিলেন। সে সুবাদে তিনি বেতাগী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সহসভাপতিও হয়েছিলেন। তখন তিনি নিজেকে বড় আওয়ামীলীগার হিসেবে পরিচয় দিতেন। গত ৫ই আগস্ট আ. লীগ সরকারের পতনের পর তিনি ভোল পাল্টে বনে যান গাউসিয়া কমিটির বড় নেতা ও মানবাধিকার কর্মী। কোন সাংবাদিক তার বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশ করলে তিনি ঐ সাংবাদিককে মামলার হুমকি ও বিভিন্ন ফেসবুক পেজে দেন পাল্টা প্রতিবাদ লিপি। বর্তমানে তিনি ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক ও পতিত পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদের নির্দেশে মাঠ পর্যায় ফ্যাসিবাদ আওয়ামী লীগের পক্ষে কাজ করছেন বলে অভিযোগ উঠছে।
সম্প্রতি তার বিরুদ্ধে জাতীয় দৈনিক ও অনলাইন নিউজ পোর্টালে খবর প্রকাশিত হলে তিনি তা ধামাচাপা দিতে দৌড়ঝাঁপ শুরু করেন। নিজ বলয়ের লোকদের দিয়ে দৈনিক দিনকাল পত্রিকার প্রতিনিধিকে 'হলুদ সাংবাদিক' আখ্যা দিয়ে ফেসবুকে বিভিন্ন কটূক্তি করায় বিষয়টি নিয়ে সাংবাদিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
এবিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক শিক্ষক জানান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত কোনো শিক্ষক সক্রিয়ভাবে রাজনৈতিক দলের পদে থাকতে পারেন না। অথচ ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আবু জাফর শিক্ষকতার পাশাপাশি বেতাগী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সহসভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়া সরকারি বিধিমালা অনুযায়ী জ্যেষ্ঠতম শিক্ষককে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব দেওয়ার কথা থাকলেও তা অনুসরণ করা হয়নি।
তাঁরা আরও জানান, ৫ ই আগস্টের পরে স্বৈরাচারের দোসররা যেখানে পালিয়ে গেছেন সেখানে তিনি আছেন বহাল তবিয়তে। কোন খুঁটির জোরে তিনি বহাল তবিয়তে থেকে বাগিয়ে নিলেন ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের চেয়ার। বর্তমান বিএনপি সরকারের বয়স ৬ মাস অতিবাহিত হলেও প্রধান শিক্ষকের পদ থেকে অপনারণ করা হয়নি পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাছান মাহমুদের অন্যতম আমলাতান্ত্রিক দোসর আবু জাফর মাস্টারকে। দ্রুত তাকে অপসারণ করে গ্রেফতার করতে হবে।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আবু জাফর মাস্টার বলেন, 'আমার বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে অভিযোগ তোলা হচ্ছে। সহকারী প্রধান শিক্ষক না থাকায় কর্তৃপক্ষ ও ম্যানেজিং কমিটি বিধি অনুযায়ী দুইবার রেজুলেশন করে আমাক দায়িত্ব দিয়েছে।
আওয়ামী রাজনীতির সাথে সরাসরি যুক্ত থাকার কথা স্বীকার করে তিনি বলেন, 'এলাকায় থাকলে তো একটুআধটু দল করতেই হয়। তবে স্কুল ফেলে কোথাও গিয়ে মিছিল মিটিং করিনি। হয়তো দুইএকটাতে গিয়েছি'।
কমিটির শীর্ষ পদে নাম থাকার বিষয়ে তিনি বলেন, 'কেউ দিয়েছে বিধায় হয়তো নাম থাকতে পারে, কিন্তু আমিতো ওঁৎপোতভাবে জড়িত নাহ্। হয়তো কোন সময় স্কুল বন্ধ থাকলে ওই বন্ধের সময়ে আওয়ামী লীগের প্রোগ্রামে গিয়েছি এতটুকু।'
সম্পাদক ও প্রকাশক : সুমন আহমেদ, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: বাইপাইল মোড়া আশুলিয়া সাভার। মোবাইল:
দৈনিক বাংলাদেশ ক্রাইম