
ঢাকা প্রতিনিধি:
রাত তখন (৩,২০)মিনিট, রাজধানীর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সামনের মহাসড়ক প্রায় নীরব, চারপাশে যখন মানুষ গভীর ঘুমে, তখন একটি বাস কাউন্টারের বেঞ্চে শুয়ে রাত কাটাচ্ছিলেন (২৩) বছরের তরুণ সোহেল মিয়া।
একসময় তার স্বপ্ন ছিল বাংলাদেশ রেলওয়ের পোশাক পরবেন, একটি স্থায়ী চাকরি করবেন এবং মায়ের মুখে হাসি ফুটাবেন, কিন্তু সেই স্বপ্ন এখন অনেকটাই দূরের গল্প, জীবিকার তাগিদে বর্তমানে একটি চায়ের দোকানে কাজ করেন তিনি। দোকান বন্ধ করে বাড়ি ফেরার সুযোগ নেই, কারণ ভোরে আবার দোকান খুলতে হয়। তাই কাউন্টারের বেঞ্চই হয়ে উঠেছে তার রাতের আশ্রয়।
ক্লান্ত শরীর, চোখে ঘুম আর বুকভরা হতাশা নিয়ে সোহেল জানান তার জীবনের গল্প,তার দাবি, বাংলাদেশ রেলওয়ের টিকিট কালেক্টর (টিসি) পদে আবেদন করে লিখিত পরীক্ষা ও ভাইভাসহ নিয়োগ প্রক্রিয়ার ধাপগুলো শেষ করার পর তার কাছে তিন লাখ টাকা দাবি করা হয়,টাকা দিতে না পারায় শেষ পর্যন্ত তার চাকরি হয়নি বলে দাবি করেন তিনি।
সোহেলের ভাষ্য, কমলাপুর রেলের অফিসে ফাইল বহনের কাজ করেন এমন এক ব্যক্তি তাকে জানিয়েছিলেন,তিন লাখ টাকা দিতে পারলে টিসি পদে তার চাকরি হয়ে যাবে।
কিন্তু দরিদ্র পরিবারের সন্তান সোহেলের পক্ষে সেই টাকা জোগাড় করা সম্ভব হয়নি,তিন লাখ টাকা থাকলে হয়তো আজ এই বেঞ্চে শুয়ে থাকতে হতো না,
নিজের কষ্টের কথা বলতে গিয়ে সোহেল বলেন,
আমার কাছে যদি তিন লাখ টাকা থাকত, তাহলে হয়তো আজ আমাকে এই বেঞ্চের ওপর ক্ষুধার্ত অবস্থায় শুয়ে থাকতে হতো না।
তার দাবি, চাকরিটি পেলে পরিবারের আর্থিক সংকট অনেকটাই কমে যেত,মাকে নিয়ে একটু স্বচ্ছল জীবন কাটানোর স্বপ্ন দেখেছিলেন তিনি,সোহেলের জীবন সংগ্রাম শুরু হয়েছে অনেক আগেই, ছোটবেলায় বাবা মরহুম আবদুল জব্বারকে হারান তিনি।
এরপর পরিবারের দায়িত্ব অনেকটাই এসে পড়ে তার কাঁধে,দুই ভাই ও তিন বোনের মধ্যে সবার ছোট সোহেল,নিজের পড়াশোনার পাশাপাশি সংসারের খরচ চালাতেও তাকে কাজ করতে হয়েছে,অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় থেকেই জীবিকার সঙ্গে লড়াই শুরু তার,অভাব তাকে স্বপ্ন দেখা থেকে থামাতে পারেনি।
ছোটবেলা থেকেই ট্রেনে ভ্রমণ করতে ভালোবাসতেন সোহেল। ট্রেনের জানালা দিয়ে দেশের প্রকৃতি দেখতে দেখতে একসময় তার মনে ইচ্ছা জাগে,একদিন তিনিও রেলওয়েতে চাকরি করবেন।
সেই স্বপ্ন পূরণের আশায় ২০২২ সালে বাংলাদেশ রেলওয়ের টিকিট কালেক্টর (টিসি) পদে আবেদন করেন, পরীক্ষা দেন, ভাইভায় অংশ নেন এবং চাকরি পাওয়ার আশায় অপেক্ষা করতে থাকেন।
কিন্তু তার দাবি, ভাইভার পরই তাকে জানানো হয় তিন লাখ টাকা দিলে চাকরি হবে,দরিদ্র পরিবারের সোহেলের কাছে সেই অর্থ ছিল না, ফলে তার ভাষ্য অনুযায়ী, অর্থের অভাবেই থেমে যায় তার বহুদিনের স্বপ্ন।
সোহেলের অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি, তবে অভিযোগটি সত্য হলে তা সরকারি চাকরির নিয়োগ প্রক্রিয়ায় দুর্নীতির একটি গুরুতর বিষয়, তাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগটি তদন্ত করে সত্যতা যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন তিনি।
স্বপ্ন ভেঙে গেলেও জীবন থামিয়ে দেননি সোহেল, বর্তমানে একটি চায়ের দোকানে কাজ করে নিজের ও পরিবারের খরচ চালাচ্ছেন, কাজের পাশাপাশি পড়াশোনাও চালিয়ে যাচ্ছেন, তিনি টঙ্গী কলেজে ডিগ্রি (বিবিএস) কোর্সে অধ্যয়নরত।
দিনের বেলা চায়ের দোকানে কাজ, আর রাতে কখনো বাস কাউন্টারের বেঞ্চে ঘুম,এভাবেই চলছে তার জীবন,তারপরও মনের ভেতর স্বপ্নটা এখনো বেঁচে আছে,আমার মতো আর কারও স্বপ্ন যেন ঘুষের কাছে হার না মানে,সোহেলের একটাই চাওয়া,সরকার যেন সরকারি চাকরিতে ঘুষ ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়।
হয়তো রেলওয়ের সেই চাকরিটি সোহেলের ভাগ্যে জোটেনি, কিন্তু তার স্বপ্ন এখনো শেষ হয়ে যায়নি, ২৩ বছরের এই তরুণ এখনো বিশ্বাস করেন, একদিন হয়তো এই বাস কাউন্টারের বেঞ্চ ছেড়ে নিজের একটি স্থায়ী ঠিকানা হবে,মায়ের মুখে আবারও হাসি ফুটবে,এই আশাতেই প্রতিদিন নতুন করে লড়াই করে যাচ্ছেন সোহেল মিয়া,কারণ দারিদ্র্য হয়তো মানুষের পথ কঠিন করে দিতে পারে, কিন্তু স্বপ্ন দেখা বন্ধ করে দিতে পারে না।
সম্পাদক ও প্রকাশক : সুমন আহমেদ, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: বাইপাইল মোড়া আশুলিয়া সাভার। মোবাইল:
দৈনিক বাংলাদেশ ক্রাইম