

স্টাফ রিপোর্টার:
বন্ধুদের সঙ্গে ফুটবল খেলা দেখতে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলেন ২০ বছর বয়সী রোহিঙ্গা যুবক আব্দুল হাফেজ। এরপর টানা ১২ দিন নিখোঁজ থাকার পর উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্প-১৫ এর জামতলী এলাকার একটি সেপটিক ট্যাংক থেকে উদ্ধার হয় তার পচাগলা মরদেহ। চাঞ্চল্যকর এ হত্যাকাণ্ডের তদন্তে অনলাইন জুয়ার টাকার বিরোধের তথ্য পাওয়ার দাবি করেছে ৮ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (৮ এপিবিএন)।
পুলিশ জানায়, গত ২২ জুন রাতে উখিয়ার এফডিএমএন ক্যাম্প-১৫, জামতলী এলাকার বাসিন্দা আব্দুল হাফেজ বন্ধুদের সঙ্গে টেলিভিশনে ফুটবল খেলা দেখতে যাওয়ার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হন। এরপর তিনি আর ফিরে না আসায় পরিবারের সদস্যরা খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। পরে পরিবারের অভিযোগের ভিত্তিতে ৮ এপিবিএনের জামতলী পুলিশ ক্যাম্প অনুসন্ধান শুরু করে।
গোয়েন্দা তথ্য ও প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে গত ৪ জুলাই রাত ৯টার দিকে ক্যাম্প-১৫ এর ব্লক-এইচ/৭ এলাকায় মোহাম্মদ রফিকের শেডসংলগ্ন একটি সেপটিক ট্যাংক থেকে আব্দুল হাফেজের অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ কক্সবাজার সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়।
এ ঘটনায় নিহতের ভাই মো. জমিনুর রহমান বাদী হয়ে উখিয়া থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলায় ১৬ জনের নাম উল্লেখ করা হয় এবং অজ্ঞাত আরও ২ থেকে ৩ জনকে আসামি করা হয়।
৮ এপিবিএনের দাবি, তদন্তে জানা গেছে যে আব্দুল হাফেজ ও প্রধান আসামি মোহাম্মদ রফিক ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন এবং তারা একসঙ্গে অনলাইন জুয়া খেলতেন। একপর্যায়ে জুয়ায় হাফেজ রফিকের কাছ থেকে প্রায় ৫৬ হাজার টাকা জিতে নেন। ওই টাকা ফেরত চাওয়াকে কেন্দ্র করে তাদের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হয়।
তদন্তকারী সংস্থার ভাষ্য অনুযায়ী, সেই বিরোধের জের ধরে রফিক ও তার সহযোগীরা পরিকল্পিতভাবে হাফেজকে ডেকে নিয়ে টিপ ছোরা ও লোহার রড দিয়ে আঘাত করে হত্যা করে। পরে মরদেহ গোপন করার উদ্দেশ্যে পাশের একটি সেপটিক ট্যাংকে ফেলে দেওয়া হয়।
পুলিশ জানায়, গত ২০ জুলাই রাতে জামতলী পুলিশ ক্যাম্পের পুলিশ পরিদর্শক তারেক মোহাম্মদ আবদুল হান্নান এবং মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই মো. আলা উদ্দিনের নেতৃত্বে অভিযান চালিয়ে প্রধান আসামি মোহাম্মদ রফিককে ক্যাম্প-১৪ এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পরদিন ২১ জুলাই কক্সবাজারের আদালতে হাজির করা হলে রফিক ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। জবানবন্দিতে হত্যার পরিকল্পনা ও ঘটনার বিবরণ উঠে এসেছে বলে জানিয়েছে তদন্তকারী সংস্থা।
মামলার তদন্তে এজাহারভুক্ত মোট ৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে প্রধান আসামি মোহাম্মদ রফিকসহ চারজন ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। গ্রেপ্তার হওয়া অন্য আসামিরা হলেন—তৈয়বা খাতুন, নাসিমা খাতুন, মো. কাশেম, মোহাম্মদ জাবের, ফেরদৌস, ফাতেমা, আয়েশা এবং সৈয়দুল ইসলাম ওরফে মলয়া।
৮ এপিবিএনের ভারপ্রাপ্ত অধিনায়ক রিয়াজ উদ্দিন আহম্মেদ, পিপিএম বলেন, “চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনে ৮ এপিবিএনের সদস্যরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করেছে। গোয়েন্দা তথ্য, প্রযুক্তির ব্যবহার ও ধারাবাহিক অভিযানের মাধ্যমে ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হয়েছে। ক্যাম্প এলাকায় অপরাধ দমনে এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমাদের অভিযান অব্যাহত থাকবে।”
তিনি আরও বলেন, “অপরাধ করে কেউ পার পাবে না। ক্যাম্প এলাকায় শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে ৮ এপিবিএন সর্বদা সক্রিয় রয়েছে।
হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন ও জড়িতদের গ্রেপ্তারের পর ক্যাম্প এলাকায় কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তবে ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধে ক্যাম্প এলাকায় আরও কার্যকর নজরদারি ও নিরাপত্তা জোরদারের দাবি জানিয়েছেন তারা।