কাউসার আহমেদ পনির:
বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের সহকারী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সুজন হাওলাদারের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, ঘুষ গ্রহণ, শিক্ষকদের হয়রানি এবং নির্ধারিত সময়ে অফিসে উপস্থিত না থাকার অভিযোগ উঠেছে। তাঁর দায়িত্ব পালন, দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালনা এবং শিক্ষকদের সঙ্গে আচরণ নিয়ে বিভিন্ন অভিযোগ সামনে এসেছে। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন অভিযোগসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তবে অভিযোগগুলোর বিষয়ে এখন পর্যন্ত স্বাধীনভাবে সত্যতা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ২৮ অক্টোবর সুজন হাওলাদার পাথরঘাটা উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে যোগদান করেন। এরপর থেকে তাঁর দায়িত্ব পালন ও দাপ্তরিক কার্যক্রম নিয়ে বিভিন্ন ধরনের অভিযোগ রয়েছে বলে জানা গেছে। তবে অভিযোগগুলোর সুনির্দিষ্ট বিবরণ, সংশ্লিষ্ট নথিপত্র এবং অভিযোগকারীদের বক্তব্য পূর্ণাঙ্গভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের প্রশাসনিক রেকর্ড ও দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নির্ধারিত সময়ে অফিসে উপস্থিত না থাকার অভিযোগ
সহকারী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সুজন হাওলাদারের বিরুদ্ধে অন্যতম অভিযোগ হলো, তিনি নিয়মিত নির্ধারিত সময়ে অফিসে উপস্থিত থাকেন না। অভিযোগকারীদের দাবি, একজন সরকারি কর্মকর্তার দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সময়ানুবর্তিতা ও নিয়মিত উপস্থিতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে প্রাথমিক শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট দাপ্তরিক কাজ, শিক্ষকদের বিভিন্ন আবেদন, প্রশাসনিক কার্যক্রম এবং প্রয়োজনীয় সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার উপস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
অভিযোগ অনুযায়ী, নির্ধারিত সময়ে তাঁর উপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন থাকায় দাপ্তরিক কার্যক্রমে কোনো ধরনের বিলম্ব হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। তবে তিনি কত দিন বা কতবার নির্ধারিত সময়ে অফিসে উপস্থিত ছিলেন না, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে এ অভিযোগের প্রকৃত অবস্থা নিশ্চিত করতে অফিসের হাজিরা খাতা, উপস্থিতি-সংক্রান্ত রেকর্ড, ছুটির তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট দাপ্তরিক নথি পর্যালোচনা করা জরুরি।
একই সঙ্গে অফিসে সেবা নিতে আসা শিক্ষক ও অন্যান্য ব্যক্তিদের বক্তব্য যাচাই করা হলে এ বিষয়ে বাস্তব চিত্র উঠে আসতে পারে। অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে দায়ী করার আগে সংশ্লিষ্ট তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ ও যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ, প্রয়োজন নিরপেক্ষ তদন্ত
সুজন হাওলাদারের বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণের অভিযোগও উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, তাঁর বিরুদ্ধে দাপ্তরিক কাজের ক্ষেত্রে অনিয়ম ও অর্থ লেনদেনের বিষয়ে তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। তবে অভিযোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নির্দিষ্ট ঘটনার বিবরণ, অর্থের পরিমাণ, লেনদেনের সময়, স্থান কিংবা প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এ কারণে ঘুষ গ্রহণের অভিযোগের সত্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়। অভিযোগটি যাচাই করতে হলে অভিযোগকারীদের বক্তব্য গ্রহণ, প্রয়োজনীয় নথিপত্র পরীক্ষা এবং সংশ্লিষ্ট দাপ্তরিক কার্যক্রম পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। পাশাপাশি কোনো অর্থ লেনদেনের অভিযোগ থাকলে তার সমর্থনে প্রাসঙ্গিক তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করাও জরুরি।
সরকারি দপ্তরে দায়িত্ব পালনকালে কোনো কর্মকর্তা অনিয়ম বা দুর্নীতিতে জড়িত থাকার অভিযোগের মুখোমুখি হলে তা যথাযথ প্রক্রিয়ায় তদন্ত করা প্রয়োজন। অভিযোগ প্রমাণিত হলে প্রচলিত বিধিবিধান অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে তদন্তের আগে অভিযোগকে প্রমাণিত ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করা সমীচীন নয়।
শিক্ষকদের হয়রানির অভিযোগ
সহকারী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সুজন হাওলাদারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন দাপ্তরিক কাজে শিক্ষকদের হয়রানি করার অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজর দেওয়া প্রয়োজন। তবে কোন শিক্ষক কী ধরনের হয়রানির শিকার হয়েছেন, কোন দাপ্তরিক কাজে সমস্যা হয়েছে কিংবা এ নিয়ে কোনো লিখিত অভিযোগ জমা দেওয়া হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় উপজেলা পর্যায়ের শিক্ষা কর্মকর্তাদের দাপ্তরিক সিদ্ধান্ত, প্রশাসনিক দায়িত্ব এবং শিক্ষকদের সঙ্গে পেশাগত যোগাযোগ গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে কোনো শিক্ষককে অযৌক্তিকভাবে হয়রানি করা হলে তা তাঁর পেশাগত দায়িত্ব পালনে প্রভাব ফেলতে পারে। একই সঙ্গে অভিযোগের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বক্তব্য ও দাপ্তরিক ব্যাখ্যা গ্রহণ করাও জরুরি।
অভিযোগগুলোর প্রকৃত অবস্থা জানতে ভুক্তভোগী হিসেবে পরিচয় দেওয়া ব্যক্তিদের বক্তব্য, লিখিত অভিযোগ, আবেদন-সংক্রান্ত নথি এবং সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্ত পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। এসব তথ্য যাচাই করা গেলে অভিযোগের ধরন ও ভিত্তি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া সম্ভব হবে।
পূর্ববর্তী কর্মস্থলেও অভিযোগের দাবি
সুজন হাওলাদারের পূর্ববর্তী কর্মস্থলেও বিভিন্ন অনিয়ম ও হয়রানি নিয়ে অভিযোগ উঠেছিল বলে দাবি করা হচ্ছে। তবে তিনি এর আগে কোথায় দায়িত্ব পালন করেছেন, সেখানে কী ধরনের অভিযোগ উঠেছিল এবং সেসব অভিযোগের বিষয়ে কোনো তদন্ত বা প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল কি না, সে বিষয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়নি।
পূর্ববর্তী কর্মস্থল নিয়ে ওঠা অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের নথিপত্র, অভিযোগের অনুলিপি, তদন্ত প্রতিবেদন এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। অতীতের কোনো অভিযোগ থাকলে সেটির নিষ্পত্তি কীভাবে হয়েছে, তা জানা গুরুত্বপূর্ণ। তবে নথি বা নির্ভরযোগ্য তথ্য ছাড়া পূর্ববর্তী কর্মস্থলের অভিযোগকে প্রমাণিত ঘটনা হিসেবে উপস্থাপন করার সুযোগ নেই।
স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি
সরকারি প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নিয়মিত অফিসে উপস্থিতি, দায়িত্বশীল আচরণ, নিরপেক্ষভাবে দাপ্তরিক কাজ সম্পন্ন করা এবং সেবাপ্রত্যাশীদের সঙ্গে পেশাগত সম্পর্ক বজায় রাখা জরুরি। বিশেষ করে শিক্ষকদের প্রশাসনিক সেবা নিশ্চিত করা এবং দাপ্তরিক কার্যক্রমে স্বচ্ছতা বজায় রাখা উপজেলা পর্যায়ের শিক্ষা প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
এ অবস্থায় সুজন হাওলাদারের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো যথাযথভাবে যাচাই করার দাবি উঠেছে। অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিরপেক্ষ অনুসন্ধান, দাপ্তরিক নথি পর্যালোচনা এবং অভিযোগকারী ও অভিযুক্ত—উভয় পক্ষের বক্তব্য গ্রহণের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন করা সম্ভব হতে পারে।
অভিযোগ প্রমাণিত হলে বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ এবং অভিযোগের ভিত্তি না পাওয়া গেলে বিষয়টি স্পষ্ট করার মাধ্যমে প্রশাসনের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা যেতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বক্তব্য পাওয়া গেলে প্রকাশ করা হবে
সুজন হাওলাদারের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে তাঁর বক্তব্য জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও এ প্রতিবেদন প্রস্তুত করা পর্যন্ত তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তাঁর বক্তব্য পাওয়া গেলে তা যথাযথ গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করা হবে।
একইভাবে অভিযোগগুলোর বিষয়ে পাথরঘাটা উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস এবং সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের বক্তব্য জানা প্রয়োজন। অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই, দাপ্তরিক রেকর্ড পর্যালোচনা এবং সংশ্লিষ্ট সবার বক্তব্যের ভিত্তিতেই এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো উচিত।

কামরুল ইসলাম, রাঙ্গুনিয়া (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি:






