বর্জ্য থেকে প্লাষ্টিক, লোহা, কাগজ ইত্যাদি কুড়িয়েই চলে সীমান্তের সংসার

শ্রীপুর (গাজীপুর) প্রতিনিধি:
যে ময়লার ভাগাড়ের পাশ দিয়ে সাধারণ মানুষ দুর্গন্ধে নাক চেপে দ্রুত চলে যান, সেখান থেকে প্লাস্টিক, লোহা, কাঁচ, কাগজসহ বিক্রিযোগ্য বিভিন্ন বর্জ্য সংগ্রহ ও বিক্রি করে চলে সীমান্তের পাঁচ সদস্যের সংসার। গাজীপুরের শ্রীপুর অংশে ঢাকা ময়মনসিংহ মহাসড়কের পাশে মানুষের ফেলে দেওয়া বর্জ্য স্তূপে প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটে সীমান্ত (৩০) ও তার ১২ বছর বয়সী ছেলে সুমনের। বর্জ কুড়িয়ে যা আয় হয়, তা দিয়েই কোনমতে চলে তাদের পাঁচ সদস্যের সংসার।

শুধু সীমান্তের পরিবারই নয়, উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় অন্তত ১৫ থেকে ২০টি পরিবার একই পেশার ওপর নির্ভরশীল। দুর্গন্ধ, বিষাক্ত বর্জ্য, সংক্রমণ এবং ধারালো বস্তু থেকে আহত হওয়ার ঝুঁকি নিয়েই প্রতিদিন জীবিকার সন্ধানে নামতে হয় তাদের।

শনিবার (২৫ জুলাই) দুপুরে সরেজমিনে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের সামিট পাওয়ার বিদ্যুৎকেন্দ্রসংলগ্ন একটি ময়লার ভাগাড়ে গিয়ে দেখা যায়, রাস্তার পাশে একটি অটোভ্যান রেখে বাবা-ছেলে বর্জ্যের স্তূপে বিক্রিযোগ্য সামগ্রী খুঁজছেন। হাতে গ্লাভস নেই, পায়ে নিরাপত্তা জুতা নেই, মুখেও নেই কোনো মাস্ক। দুর্গন্ধ উপেক্ষা করে তারা প্লাস্টিক, লোহা, কাঁচ, কাগজসহ বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য সংগ্রহ করছেন। সংগ্রহ করা সামগ্রী বস্তায় ভরে আবারও নতুন করে খোঁজাখুঁজিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন।

ময়মনসিংহের নেত্রকোনা জেলার বাসিন্দা সীমান্ত বর্তমানে শ্রীপুর উপজেলার তেলিহাটি ইউনিয়নের মুলাইদ এমসি বাজারের মাজম আলী মোড় এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকেন। তিনি জানান, প্রায় ১০ বছর ধরে এ পেশার সঙ্গে জড়িত। প্রতিদিন সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত ছয় থেকে সাত ঘণ্টা বর্জ্য সংগ্রহ করেন। এরপর বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত ঝালমুড়ি বিক্রি করেন। কুড়িয়ে পাওয়া বর্জ্য এমসি বাজারের একটি ভাঙারির দোকানে বিক্রি করে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৭০০ /৭৫০ টাকার মালামাল বিক্রি হয়। মাসে আয় হয় প্রায় ২২থেকে ২৩ হাজার টাকা। এই আয় দিয়েই সংসারের ব্যয় ও ছোট মেয়ের লেখাপড়ার খরচ চালাতে হয়।

সীমান্ত বলেন, “তিন বছর আগে বিষাক্ত বর্জ্যের সংস্পর্শে এসে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছিলাম। প্রায় এক সপ্তাহ চিকিৎসাধীন ছিলাম। কিন্তু বিকল্প কোনো আয়ের উৎস না থাকায় সুস্থ হওয়ার পর আবারও এই কাজেই ফিরতে হয়েছে।”

একই পেশায় প্রায় ১২ বছর ধরে কাজ করা আরিফ (৩১) জানান, শিল্পকারখানা ও বাসাবাড়ির ফেলে দেওয়া বর্জ্যের মধ্যে অনেক সময় মূল্যবান সামগ্রীও পাওয়া যায়। তবে দুর্গন্ধ, বিষাক্ত গ্যাস, ধারালো কাঁচ ও লোহার কারণে প্রতিদিনই ঝুঁকি নিয়ে কাজ করতে হয়।

তিনি বলেন, ধারালো কাঁচ বা লোহার আঘাতে প্রায়ই হাত-পা কেটে যায়। গ্লাভস, নিরাপত্তা জুতা ও মাস্ক থাকলে অন্তত কিছুটা নিরাপদে কাজ করা যেত।”

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার বিভিন্ন বর্জ্য ভাগাড়ে প্রতিদিন আরও বহু মানুষ জীবিকার তাগিদে বর্জ্য সংগ্রহ করেন। কিন্তু তাদের জন্য নেই কোনো ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম, নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবা কিংবা সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সুবিধা।

মাওনা ইউনিয়ন পরিষদের ১ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য শামীম মৃধা বলেন, “অনেক অসহায় পরিবার জীবিকার জন্য বর্জ্য সংগ্রহের ওপর নির্ভরশীল। তাদের নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসুরক্ষা এবং জীবনমান উন্নয়নে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। পাশাপাশি যত্রতত্র বর্জ্য ফেলা বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন।”

জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, খোলা জায়গায় অপরিকল্পিতভাবে বর্জ্য ফেলে রাখার ফলে পরিবেশ দূষণের পাশাপাশি বর্জ্য সংগ্রহকারীরা সংক্রমণ, চর্মরোগ, শ্বাসকষ্ট, বিষাক্ত রাসায়নিকের সংস্পর্শ এবং দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন। তাই তাদের জন্য ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম নিশ্চিত করা, নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবা প্রদান এবং আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা সময়ের গুরুত্বপূর্ণ দাবি।

স্থানীয়দের প্রত্যাশা, জীবিকার তাগিদে ঝুঁকিপূর্ণ এই পেশায় নিয়োজিত মানুষদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে সরকার, স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করবে।

নিউজটি আপনার স্যোসাল নেটওয়ার্কে শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Many players prefer ultra casino because of its balance between functionality and simplicity. Avoiding overly complex menus helps users stay focused on games. This is particularly important for mobile casino players using smaller screens.