
স্টাফ রিপোর্টার:
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের ঢাকা বিভাগের উপপরিচালক (ঢাকা) মোঃ ছালেহ উদ্দিনকে ঘিরে নানা ধরনের অভিযোগ উঠেছে। দীর্ঘদিন ধরে ঢাকায় গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন, প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সুযোগ নিয়ে পদায়ন ও প্রভাব বিস্তার, নিয়োগ ও বিভিন্ন কার্যক্রমে আর্থিক অনিয়মসহ তার বিরুদ্ধে একাধিক গুরুতর অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
অভিযোগ রয়েছে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতা মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়ার ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত ছিলেন ছালেহ উদ্দিন। চাঁদপুরের বাসিন্দা হওয়ার সুবাদে মায়ার সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল বলেও দাবি করেন সংশ্লিষ্টরা। সেই রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে চাকরি জীবনের দীর্ঘ সময় ঢাকাতেই দায়িত্ব পালন করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, পরিদর্শক হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় ঢাকায় ছিলেন ছালেহ উদ্দিন। পরবর্তীতে সিনিয়র স্টেশন অফিসার, উপ-সহকারী পরিচালক ও সহকারী পরিচালক পদেও ঢাকায় দায়িত্ব পালনের সুযোগ পান তিনি। বর্তমানে উপপরিচালক (ঢাকা), উপপরিচালকের দপ্তর, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স, ঢাকা বিভাগ, ঢাকা পদে দায়িত্ব পালন করছেন।
ফলে তার দীর্ঘ কর্মজীবনে ঢাকার বাইরে পদায়ন নিয়ে অধিদপ্তরের ভেতরে নানা প্রশ্ন ও কানাঘুষা রয়েছে। অভিযোগকারীদের প্রশ্ন—একজন সরকারি কর্মকর্তার চাকরি জীবনের দীর্ঘ সময় যদি একই শহরে গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালনের সুযোগ তৈরি হয়, তাহলে এর পেছনে কোনো বিশেষ প্রভাব বা সুপারিশ কাজ করেছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
বিপুল সম্পদের মালিক হওয়ার অভিযোগ
উপপরিচালক ছালেহ উদ্দিনের বিরুদ্ধে চাকরিজীবনে দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল সম্পদের মালিক হওয়ার অভিযোগও উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, তার নামে-বেনামে ঢাকার বসিলা এলাকায় একাধিক প্লট এবং তেজগাঁও এলাকায় একাধিক ফ্ল্যাট রয়েছে। জন্মস্থান চাঁদপুরেও বিপুল পরিমাণ জমি রয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন তারা।
তবে এসব সম্পদের প্রকৃত মালিকানা, ক্রয়ের অর্থের উৎস এবং তার ঘোষিত আয়-ব্যয়ের সঙ্গে সম্পদের সামঞ্জস্য সম্পর্কে স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ফলে অভিযোগগুলোর সত্যতা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নিয়োগ ও বিভিন্ন কার্যক্রমে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ
ছালেহ উদ্দিনের বিরুদ্ধে ফায়ার সার্ভিসের বিভিন্ন নিয়োগ ও কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে অর্থ লেনদেনের অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, বিভিন্ন ধরনের কাজ ও সুযোগ দেওয়ার কথা বলে সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে অর্থ নেওয়া হয়ে থাকে।
এ ছাড়া বিভিন্ন ফায়ার রিপোর্টের ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট হারে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ করেছেন কয়েকজন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি। তাদের দাবি, প্রতিটি রিপোর্টে প্রায় ৫ শতাংশ পর্যন্ত অর্থ নেওয়া হয়।
অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য, নথিপত্র এবং আর্থিক লেনদেনের তথ্য পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তাদের ঘিরেও প্রশ্ন
ছালেহ উদ্দিনের ঘনিষ্ঠ হিসেবে সিনিয়র স্টেশন অফিসার নাজিম ও রাজীবের নামও বিভিন্ন অভিযোগে উঠে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, তাদের মাধ্যমে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা এবং কিছু সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা হয়।
আরও অভিযোগ রয়েছে, অধিদপ্তরের ভেতরে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি ছালেহ উদ্দিন নিয়মিত তেজগাঁও এলাকায় সিনিয়র স্টেশন অফিসার নাজিমের ফ্ল্যাটে অবস্থান করেন। তাদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে বলেও সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ দাবি করেছেন। তবে এ অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
প্রায় এক কোটি টাকার বরাদ্দ নিয়ে অভিযোগ
চলতি বছরের জুন-জুলাই সময়ে বরাদ্দ করা প্রায় এক কোটি টাকার মালামাল ক্রয়ে অনিয়মের অভিযোগও উঠেছে ছালেহ উদ্দিনের বিরুদ্ধে। অভিযোগকারীদের দাবি, বরাদ্দের অর্থের বিপরীতে যথাযথভাবে মালামাল কেনা হয়নি এবং অর্থ আত্মসাতের ঘটনা ঘটেছে।
তবে এ অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট ক্রয় নথি, বিল-ভাউচার, টেন্ডার প্রক্রিয়া, সরবরাহকারীর তথ্য এবং মালামাল গ্রহণের রেকর্ড পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
বিভিন্ন আয়োজনের নামে অর্থ সংগ্রহের অভিযোগ
ফায়ার সার্ভিসের নিয়মিত কার্যক্রমের পাশাপাশি বিভিন্ন প্রতিযোগিতা ও আয়োজনের নামে অর্থ সংগ্রহের অভিযোগও রয়েছে। ম্যারাথন দৌড়, ফুটবলসহ বিভিন্ন ক্রীড়া আয়োজনকে কেন্দ্র করে অর্থ নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
অভিযোগকারীদের দাবি, এসব আয়োজনের কারণে ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি অংশ বিভিন্ন কর্মসূচিতে ব্যস্ত থাকছেন। এতে জরুরি মুহূর্তে অগ্নিনির্বাপণ ও উদ্ধার কার্যক্রমে জনবল সংকট তৈরি হচ্ছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
বিশেষ করে অগ্নিকাণ্ডের খবর পাওয়ার পর দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছানো ফায়ার সার্ভিসের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। ফলে প্রশাসনিক বা আনুষঙ্গিক কর্মসূচির কারণে জরুরি সেবায় কোনো ধরনের বিঘ্ন ঘটছে কি না, সেটিও কর্তৃপক্ষের নজরে আনা প্রয়োজন।
রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন
ছালেহ উদ্দিনের বিরুদ্ধে আলোচিত অভিযোগগুলোর একটি হলো রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে দীর্ঘদিন ঢাকায় অবস্থান করা। অভিযোগকারীদের কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ থাকলেও বর্তমানে তিনি কীভাবে একইভাবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে বহাল রয়েছেন?
তাদের ভাষ্য, সরকার পরিবর্তনের পরও যদি একজন কর্মকর্তার প্রভাব অক্ষুণ্ন থাকে, তাহলে তার পদায়ন ও দায়িত্ব পালনের বিষয়টি প্রশাসনিকভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
অভিযোগ অস্বীকার ছালেহ উদ্দিনের
এসব অভিযোগের বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে মোঃ ছালেহ উদ্দিন, উপপরিচালক (ঢাকা), উপপরিচালকের দপ্তর, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স, ঢাকা বিভাগ, ঢাকা বলেন, তার বাড়ি চাঁদপুরে—এটি সত্য এবং দীর্ঘদিন ধরে তিনি ঢাকায় কর্মরত রয়েছেন—এটিও সত্য। তবে তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো সঠিক নয় বলে দাবি করেন তিনি।
তিনি নিজেকে একজন ভালো মানুষ দাবি করে বলেন, তার বিরুদ্ধে করা সব অভিযোগ সত্য নয়।
নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ জরুরি সেবা প্রতিষ্ঠানের একজন কর্মকর্তাকে ঘিরে এতগুলো অভিযোগ ওঠায় বিষয়টি নিয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশেষ করে দীর্ঘদিন ঢাকায় পদায়ন, সম্পদের হিসাব, নিয়োগ ও বিভিন্ন কার্যক্রমে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ, প্রায় এক কোটি টাকার মালামাল ক্রয়ে অনিয়মের অভিযোগ এবং বিভিন্ন আয়োজনের নামে অর্থ সংগ্রহ—এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাই করে সত্যতা বের করা প্রয়োজন।
অভিযোগগুলো সত্য হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া এবং অভিযোগগুলো অসত্য হলে তা তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার করার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
উপপরিচালক মোঃ ছালেহ উদ্দিনকে ঘিরে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে পদায়নের ইতিহাস, সম্পদের তথ্য, ক্রয়সংক্রান্ত নথি এবং ফায়ার সার্ভিসের অভ্যন্তরীণ কার্যক্রমের আরও তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। অভিযোগগুলোর বিষয়ে যাচাইযোগ্য তথ্য ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পাওয়া গেলে পরবর্তী প্রতিবেদনে তা তুলে ধরা হবে।

Leave a Reply