সাংবাদিকতার আড়ালে ব্ল্যাকমেইল সিন্ডিকেট: ভূঁইফোড় পোর্টালের চাঁদাবাজিতে অতিষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তারা

নিজস্ব প্রতিবেদক:

দেশের মূলধারার সাংবাদিকতাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে এবং প্রচলিত আইনকে তোয়াক্কা না করে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা একগুচ্ছ নিবন্ধনহীন ভূঁইফোড় অনলাইন নিউজ পোর্টাল বর্তমানে রীতিমতো ‘চাঁদাবাজি সিন্ডিকেটে’ পরিণত হয়েছে। ‘দৈনিক আমার স্বাধীন বাংলাদেশ’, ‘দৈনিক বাংলাদেশ আমার মাতৃভূমি’, ‘দুর্নীতির ডায়েরি’, ‘এনবিবি (NBB)’, ‘সকালের ডাক’, ‘সাজের বেলা’‘নবান্নের আলো’-এর মতো নামসর্বস্ব পোর্টালগুলো এখন সরকারি কর্মকর্তাদের ব্ল্যাকমেইল করার প্রধান হাতিয়ার হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোনো প্রকার তথ্য-প্রমাণ বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য ছাড়াই মনগড়া সংবাদ সাজিয়ে প্রথমে তা অনলাইন ও সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল করা হয় এবং পরবর্তীতে সংবাদ নামানোর বিনিময়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে এই চক্রটি।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এসব নিউজ পোর্টালের ওয়েবসাইটে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের যে ঠিকানা ব্যবহার করা হয়েছে, বাস্তবে সেখানে কোনো অফিসের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি। এমনকি যোগাযোগের জন্য দেওয়া নম্বরগুলোও সুকৌশলে অধিকাংশ সময় বন্ধ রাখা হয়। অভিযুক্ত এসব পোর্টালের কর্তৃপক্ষের সাথে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কাউকে পাওয়া যায়নি। তাদের অফিসিয়াল নম্বরে কল করা হলে তা বন্ধ পাওয়া যায় এবং ঠিকানায় গিয়ে কাউকে না পাওয়ায় তাদের কোনো বক্তব্য গ্রহণ করা সম্ভব হয়নি। মূলত ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকেই তারা এই সাইবার অপরাধ ও চাঁদাবাজি কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে।

সরকারি কোনো নিবন্ধন বা আইনি বৈধতা না থাকলেও এরা দীর্ঘ দিন ধরে ‘গণমাধ্যম’ পরিচয় দিয়ে বন বিভাগ, গণপূর্ত অধিদপ্তর, পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো), শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর (EED), জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর এবং স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরের কর্মকর্তাদের টার্গেট করে আসছে। বিশেষ করে বর্তমান প্রেক্ষাপটে কর্মকর্তাদের ‘আওয়ামী দোসর’ বা ‘দুর্নীতিবাজ’ সাজিয়ে তথ্যবিহীন সংবাদ প্রচারের ভয় দেখিয়ে দেদারসে চাঁদাবাজি চালানো হচ্ছে।

ভুক্তভোগী কর্মকর্তাদের ভাষ্যমতে, এই চক্রটি অত্যন্ত সুসংগঠিত। শিক্ষা প্রকৌশল ও গণপূর্ত অধিদপ্তরের কয়েকজন প্রকৌশলী ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, এই চক্রটির যন্ত্রণায় তাঁরা অতিষ্ঠ। নিজেদের এবং পারিবারিক সম্মানের কথা চিন্তা করে অনেক সময় তাদের চাহিদা অনুযায়ী টাকা দিলেও রেহাই মেলে না। এক পোর্টালে টাকা দেওয়ার কয়েকদিন পরই অন্য একটি বেনামী পোর্টালে একই মিথ্যা তথ্য দিয়ে আবারও সংবাদ প্রচার করা হয় এবং নতুন করে টাকা দাবি করা হয়। এরা মূলত পেশাদার চাঁদাবাজ, সাংবাদিকতার সাথে এদের কোনো সম্পর্ক নেই।

বন বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, এই চক্রটি দীর্ঘ সময় ধরে সাংবাদিকতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তাদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে। ফলে মূলধারার নিবন্ধিত গণমাধ্যমগুলোকেও সাধারণ মানুষ ও কর্মকর্তাদের নিকট সন্দেহের চোখে দেখতে হচ্ছে, যা সামগ্রিক গণমাধ্যম জগতের জন্য এক বড় হুমকি। প্রতিবেদকের হাতে আসা বেশ কিছু তথ্য-প্রমাণে দেখা যায়, এই চক্রটি তাদের চাঁদাবাজির টাকা লেনদেনে ডাচ-বাংলা ব্যাংক, বিকাশ এবং নগদ অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করছে। গণমাধ্যমের নাম ব্যবহার করে সরাসরি কর্মকর্তাদের নিকট থেকে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার একাধিক কল রেকর্ড ও লেনদেনের অকাট্য প্রমাণ এখন প্রশাসনের নাগালের মধ্যে রয়েছে।

মানবাধিকার কর্মী ও সাংবাদিক নেতা শাহিন বিশ্বাস এ প্রসঙ্গে বলেন, “গণমাধ্যমকে বলা হয় সমাজের দর্পণ এবং মানুষের অধিকার আদায়ের শেষ অস্ত্র। অথচ নিবন্ধনহীন ভূঁইফোড় কোনো চক্র যদি এই পবিত্র সাইনবোর্ড ব্যবহার করে চাঁদাবাজি ও দস্যুতা চালায়, তবে তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনের কঠোরতম ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। এদের কারণে মূলধারার সাংবাদিকতা আজ হুমকির মুখে।” জানা গেছে, এই সংঘবদ্ধ চাঁদাবাজ চক্রের বিরুদ্ধে এবং অবৈধ নিউজ পোর্টালগুলোর কার্যক্রম চিরতরে বন্ধের দাবিতে প্রতিটি আক্রান্ত দপ্তরের পক্ষ থেকে পৃথক মামলার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। একই সাথে বিটিআরসি (BTRC) এবং তথ্য মন্ত্রণালয়কে এসব অবৈধ সাইট বন্ধের জন্য আনুষ্ঠানিক চিঠি দেওয়ার প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে। মূলধারার গণমাধ্যমকর্মীরাও এই অপসাংবাদিকতা প্রতিহত করতে প্রশাসনের পাশে থাকার অঙ্গীকার করেছেন।

নিউজটি আপনার স্যোসাল নেটওয়ার্কে শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Many players prefer ultra casino because of its balance between functionality and simplicity. Avoiding overly complex menus helps users stay focused on games. This is particularly important for mobile casino players using smaller screens.