
আলমাস হোসাইন : ঢাকা জেলা প্রতিনিধি
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতা আন্দোলনের ঢেউয়ে সরকার পতনের পর সারাদেশের মতো রাজধানীসংলগ্ন শিল্পাঞ্চল আশুলিয়াতেও দেখা দেয় প্রশাসনিক অস্থিরতা। পুলিশের বহু কর্মকর্তা তখন বদলি বা ক্লোজড হন। বিশেষ করে আশুলিয়া থানা যেন পরিণত হয় ওসি বদলির ল্যাবরেটরিতে মাত্র এক বছরের ব্যবধানে চারজন অফিসার ইনচার্জ (ওসি) দায়িত্ব হারান।
প্রশাসনিক সূত্র জানায়, প্রতিটি বদলির পেছনেই ছিল অঘোষিত কোনো না কোনো চাপ বা প্রভাব। কেউ সাংবাদিকদের সঙ্গে ‘বনিবনা না হওয়া’, আবার কেউ স্থানীয় প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ায় পড়েছেন বিপাকে।
এই পটভূমিতেই ২০২৫ সালের ২৫ জুন দায়িত্ব নেন নতুন অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আব্দুল হান্নান। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই থানা ও আশপাশের চিত্র যেন পাল্টে যেতে শুরু করে।
অপরাধ দমনে কঠোর, সেবায় মানবিক
দায়িত্ব নেওয়ার কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই আশুলিয়া থানার আইনশৃঙ্খলায় আসে দৃশ্যমান পরিবর্তন। একসময় খুন, ডাকাতি, ধর্ষণ ও মাদক বাণিজ্যের জন্য কুখ্যাত এলাকা এখন অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে এসেছে।
থানার সামনে দাঁড়িয়ে কথা বললে সেই পরিবর্তনের ছোঁয়া পাওয়া যায়।
পোশাকশ্রমিক মোসাঃ সনিয়া আক্তার (২২) বলেন,
আমি আমার মায়ের সঙ্গে দক্ষিণ গাজীরচটে ভাড়া বাসায় থাকি এবং একটি ফ্যাক্টরিতে চাকরি করি। প্রতিদিন যাওয়া-আসার পথে এক ছেলে আমাকে নিয়মিত বিরক্ত করত। উপায়ন্তু না দেখে ওসি স্যারের কাছে অভিযোগ করলে তিনি সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেন। এখন আমি নিরাপদে চলাচল করতে পারি। এজন্য কোনো টাকা-পয়সাও লাগেনি।
স্থানীয় ব্যবসায়ী আব্দুল করিম বলেন,
আমাদের একটি জমি একদল দখলবাজ জোর করে দখল নিয়েছিল। আগের ওসিদের কাছে গেলে কোনো ফল পাইনি। কিন্তু হান্নান স্যার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে সবকিছু বদলে গেছে। এখন মনে হয়, আইন সত্যিই জনগণের পাশে আছে।
একজন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় সাংবাদিক বলেন,
আগে থানায় গেলে সাধারণ মানুষ ভয়ে কাঁপত। এখন তারা নিজেরাই থানায় আসে, অভিযোগ করে, আর সাড়া পায়। এটি সত্যিই বড় পরিবর্তন।
অভিযান অব্যাহত — মাদক ও দখলবাজদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স
পুলিশ সূত্র জানায়, ওসি হান্নানের নেতৃত্বে আশুলিয়া থানায় প্রতিদিনই নিয়মিত টহল পরিচালিত হচ্ছে।
মাদকবিরোধী অভিযানে ধরা পড়ছে একের পর এক চক্র। চাঁদাবাজি, দখলবাজি ও প্রভাবশালী অপরাধীদের বিরুদ্ধেও চলছে অভিযান।
একজন পুলিশ কর্মকর্তা বলেন,
আগে যারা থানার আশপাশে প্রভাব খাটিয়ে দালালি করত ও ঘুষ বাণিজ্য চালাত, তারা এখন অচল হয়ে পড়েছে। এই চক্রই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও কিছু অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে অপপ্রচার চালাচ্ছে।
অপপ্রচারের নিশানায় ওসি হান্নান
সম্প্রতি একটি অনলাইন গণমাধ্যমে ওসি হান্নানের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ তুলে প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়।
পুলিশের অভ্যন্তরীণ সূত্র বলছে, প্রতিবেদনটি ছিল উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। কারণ, দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই ওসি হান্নান থানার ভেতরে দালালচক্র ও ঘুষ লেনদেন বন্ধ করে দিয়েছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সিনিয়র সাংবাদিক বলেন,
অনেক সময় দেখা যায়, কোনো কোনো পুলিশ কর্মকর্তা সাংবাদিকদের অযৌক্তিক সুবিধা না দিলে তারা সংবাদকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে চাপ সৃষ্টি করে। ওসি হান্নান হয়তো সেই ফাঁদে পড়েননি। তাই তার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ তোলা হচ্ছে।
জনগণের পাশে থাকলে অপরাধ কমে যায় ওসি হান্নান
যোগাযোগ করা হলে আশুলিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আব্দুল হান্নান বলেন,
আমি বিশ্বাস করি, পুলিশ যদি জনগণের পাশে থাকে, অপরাধ নিজে থেকেই কমে যায়। আমরা জেলা পুলিশ সুপার আনিসুজ্জামান স্যারের নির্দেশনায় আশুলিয়াকে একটি শান্ত, নিরাপদ ও মডেল থানা হিসেবে গড়ে তুলতে কাজ করছি।
তিনি আরও বলেন,
আমার বিরুদ্ধে প্রকাশিত প্রতিবেদনটি সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। আমি কাজ করছি জনগণের আস্থা ফেরাতে, কোনো স্বার্থগোষ্ঠীর মন রক্ষার জন্য নয়।”
ওসি পরিবর্তনের রেকর্ড ও সাংবাদিক প্রভাব
ছাত্র-জনতা আন্দোলনের পর আশুলিয়া থানায় এখন পর্যন্ত চারজন ওসি ক্লোজড হয়েছেন। প্রশাসনিক অভ্যন্তরীণ সূত্র বলছে, এই থানা যেন এক প্রকার রাজনৈতিক ও সাংবাদিক চাপের বলয়ে আটকে আছে। কেউ অতিরিক্ত কঠোর হলে বা কারও স্বার্থে আঘাত লাগলেই শুরু হয় বদলির প্রক্রিয়া।
বিশ্লেষকদের মতে, দেশে বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা যেখানে ক্রমেই চ্যালেঞ্জের মুখে, সেখানে স্থানীয় পর্যায়ের কিছু সংবাদকর্মী প্রশাসনের ওপর অযথা প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করেন। এর ফলেই সৎ কর্মকর্তা ও ন্যায়ের পক্ষে থাকা ব্যক্তিরা পড়ে যান মিথ্যা অভিযোগের জালে।
বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার আহ্বান
সচেতন মহল বলছে, গণমাধ্যম সমাজের দর্পণ— কিন্তু যখন সেই দর্পণ বিকৃত হয়ে যায়, তখন সত্য বিকৃত হয়, বিভ্রান্তি ছড়ায়।
ওসি হান্নানের বিরুদ্ধে যে অপপ্রচার চলছে, তা শুধু একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নয়; এটি প্রকৃত সাংবাদিকতার নীতির বিরুদ্ধেও আঘাত।
একজন সিনিয়র সমাজকর্মী বলেন,
যে সাংবাদিক জনগণের কথা না বলে ব্যক্তিগত স্বার্থে কলম চালায়, সে আসলে জনগণের শত্রু। সত্যিকারের সাংবাদিকতা মানে হচ্ছে সত্যের পক্ষে থাকা।
শেষকথা
বর্তমান আশুলিয়া থানা শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী প্রতিষ্ঠান নয়— এটি এখন হয়ে উঠছে জনআস্থার কেন্দ্রবিন্দু।
ওসি আব্দুল হান্নানের নেতৃত্বে পুলিশের দায়িত্ববোধ, মানবিকতা ও সততার নতুন দৃষ্টান্ত তৈরি হয়েছে।
তবে তার বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচার যেন এই অর্জনকে ম্লান না করে— এমনটাই প্রত্যাশা আশুলিয়ার সাধারণ মানুষের।