শিদলাই ইউনিয়ন ভূমি অফিসে ঘুষ ও অনিয়মের অভিযোগ

স্টাফ রিপোর্টার:

 

কুমিল্লা জেলার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার শিদলাই ইউনিয়ন ভূমি অফিসে ঘুষ ও অনিয়মের অভিযোগ ক্রমেই বেড়েই চলেছে। সাধারণ মানুষ জমি সংক্রান্ত কাজের জন্য গেলে এখানে সরকারি নিয়মের পরিবর্তে ব্যক্তিগত লেনদেন ও দালাল ব্যবস্থার শিকার হচ্ছেন। স্থানীয়রা জানাচ্ছেন, এই অনিয়ম ও ঘুষের কারণে সাধারণ মানুষ অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

সমাজের নানা ক্ষেত্রে দুর্নীতি এমন এক নোঙ্গর হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা দেশের উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করছে। শিদলাই ইউনিয়ন ভূমি অফিসও এর ব্যতিক্রম নয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, নায়েব ভূমি সহকারী কর্মকর্তা শাহজাদী তাহমিনা, যিনি এলাকায় ‘নায়েক শাহজাদী’ নামে পরিচিত, সরকারি বেতন মাত্র ৪০–৫০ হাজার টাকার মধ্যে থাকলেও নানা অনিয়মের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার অঢেল সম্পদের মালিক হয়েছেন।

ভুক্তভোগীদের বরাত দিয়ে জানা যায়, জমি সংক্রান্ত যে কোনো কাজ—খারিজ, নামজারি, খাজনা, পর্চা—শাহজাদী তাহমিনার মাধ্যমে হলে মোটা অঙ্কের অর্থ দিতে হয়। শিদলাই ইউনিয়ন পরিষদের বেড়াখলা গ্রামের রুজিনা লেখম জানান, তিনি বাবার জমি নামজারি করতে গেলে শাহজাদী তাহমিনা তার নিকট ১৯ হাজার টাকা গ্রহণ করে খারিজ কার্যক্রম সম্পন্ন করেন। একইভাবে, ইতালি প্রবাসী মোঃ ফারুক সরকার জানান, মসজিদের নামে জমি ওয়াকল করেও তিনি শাহজাদী তাহমিনার নিকট ৪২ হাজার টাকা দিয়েই নামজারি কার্যক্রম সম্পন্ন করতে বাধ্য হন।

স্থানীয়রা আরও অভিযোগ করেছেন, জমি সংক্রান্ত কাজের জন্য ফাইল জিম্মি রাখা, দালাল ব্যবহার এবং মোটা অঙ্কের টাকা আদায়ই শিদলাই ইউনিয়ন ভূমি অফিসের মূল ধারা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভুক্তভোগী হালিমা আক্তার জানান, নায়েব ছাড়া কোনো কাজই এখানে হয় না, অফিসের অন্যান্য কর্মকর্তা বা কর্মচারী কার্যক্রমে সরাসরি অংশগ্রহণ করেন না।

জমির কাজের জটিলতা অনুযায়ী অর্থের পরিমাণও ভিন্ন হয়। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, সাধারণ নামজারির জন্য কয়েক হাজার টাকা, জটিল জমির ক্ষেত্রে ১০ হাজার থেকে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ দিতে হয়। নজরুল ইসলাম খন্দকার জানান, তার একটি জমি বিক্রির কারণে নামজারি করতে গিয়ে শাহজাদী তাহমিনা দালাল রাসেলের মাধ্যমে ১৯ হাজার টাকা নেন। এমন ঘটনা নিয়মিত পর্যায়ে ঘটছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

শাহজাদী তাহমিনার কার্যক্রম শুধু অর্থের লেনদেনেই সীমাবদ্ধ নয়; গ্রাহকদের সঙ্গে আচরণও ন্যায্য নয়। এক প্রবাসী জানান, জমির জন্য তিনি অফিসে গেলে নায়েব তার সঙ্গে অসম্মানজনক আচরণ করেছেন এবং টাকা ছাড়া কোনো কাজ সম্পন্ন হয়নি। স্থানীয়রা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, এই ধরনের কর্মকাণ্ড চলতে থাকলে সাধারণ মানুষের মধ্যে অসন্তোষ আরও বৃদ্ধি পাবে।

স্থানীয় দালালরা বলছেন, নায়েবের অধীনে লেনদেনের ক্ষেত্রে দালালদের মাধ্যমে টাকা আদায় করা হয়। মোঃ আবু কাউছার জানান, জমির খাজনা আদায় ও নামজারি কার্যক্রমে নায়েবের অনুমতি ছাড়া কোনো কাজ সম্পন্ন হয় না। প্রাক্তন পুলিশ কর্মকর্তা মোঃ আবু জাহের জানান, নায়েব নিজের সুবিধার জন্য সমস্ত ফাইলের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখেন এবং বিনা অর্থে কোনো কাজ করতে দেন না।

শাহজাদী তাহমিনা দীর্ঘদিন ধরে ভূমি অফিসে কাজ করছেন। সরকারি চাকরির পাশাপাশি তিনি নানাভাবে মোটা অঙ্কের সম্পদ অর্জন করেছেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, তিনি দালালদের মাধ্যমে কাজ করান এবং জমি সংক্রান্ত যেকোনো জটিল কাজে অর্থ আদায় করে থাকেন।

অপরাধ বিচিত্রা প্রতিনিধিকে এক সাক্ষাৎকারে নায়েব তাহমিনা বলেন, “ভাই, আমার চাকরি আর এক বছর আছে, এ সময় সংবাদ প্রকাশ না করার অনুরোধ করছি। আমি সরকারি নিয়ম মেনে কাজ করি।” অন্যদিকে, উপজেলা সহকারী কমিশনার ভূমি ফোন রিসিভ না করার কারণে বিষয়টি যাচাই সম্ভব হয়নি। তিনি জানান, যদি যথাযথ অভিযোগ প্রমাণিত হয়, তাহলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

স্থানীয়রা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, যদি এমন অনিয়ম চলতে থাকে, তাহলে প্রশাসনিক ব্যবস্থা ও জনবিশ্বাসের ক্ষতি হবে। শিদলাই ইউনিয়ন ভূমি অফিসের ফাইল জিম্মি, দালাল ব্যবস্থাপনা এবং মোটা অঙ্কের অর্থ আদায়ের ফলে সাধারণ মানুষ আর্থিক ও সামাজিকভাবে হুমকির মুখে পড়ছেন।

একজন দালাল আশরাফ জানান, “আমি কাজের জন্য টাকা নিয়েছি, কিন্তু তা নায়েবকে দিয়েছি। সরকারী ফি থাকলেও নায়েবের মাধ্যমে কাজ করতে গেলে অতিরিক্ত অর্থ দিতে হয়।” ইতালি প্রবাসী মোঃ শরিফুল ইসলাম বলেন, “শাহজাদী তাহমিনা টাকা নিয়ে কাজ সম্পন্ন করেন না। আমার জমি নামজারি করতে গিয়ে লক্ষ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। আমি বাধ্য হয়ে উচ্চতর কর্মকর্তার কাছে যেতে বাধ্য হই।”

বিএনপি ইউনিয়ন সভাপতি মোঃ বায়েজিদ হোসেন রানা জানান, নায়েব নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না এবং প্রতিটি ফাইলের জন্য অর্থ আদায় করেন। তিনি বলেন, “আমরা অফিসে গিয়ে বিষয়টি বুঝানোর চেষ্টা করেছি, কিন্তু নায়েব আমাদের কথা তোয়াক্কা করেন না। তিনি নিজের ঘুষের রাজত্ব বজায় রাখছেন।”

প্রতিনিধিকে নায়েবের সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাৎকারের সময় দেখা যায়, তিনি সাংবাদিককে চায়ের আপ্যায়নের মাধ্যমে বিষয়টি ‘নির্ধারিত’ করার চেষ্টা করেছিলেন। এই ঘটনা প্রমাণ করে, শিদলাই ইউনিয়ন ভূমি অফিসে ঘুষ ও অনিয়ম কেবল সাধারণ জনগণের জন্য নয়, সাংবাদিকতার জন্যও চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করছে।

স্থানীয়রা সরকারের দ্রুত পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন। তারা আশা করছেন, নায়েব শাহজাদী তাহমিনার বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করলে ভূমি অফিসে স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে এবং সাধারণ মানুষ নিরাপদ ও সুবিচারমূলক সেবা পাবেন।

শিদলাই ইউনিয়ন ভূমি অফিসে দীর্ঘদিন ধরে চলমান এই অনিয়ম এবং ঘুষের চক্র ভেঙে দেওয়া না গেলে, এটি কেবল ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলায় নয়, আশেপাশের এলাকা থেকেও ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। স্থানীয় জনগণ সতর্ক করে বলেছেন, সরকারি পদে থাকা কর্মকর্তা যদি নিজের স্বার্থে চলেন, তাহলে জনগণের আস্থা হারিয়ে যাবে এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থার প্রতি মানুষের বিশ্বাস ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার অপরাধ বিচিত্রাকে জানিয়েছেন, তিনি অভিযোগ পেয়েছেন এবং বিষয়টি যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে রিপোর্ট করেছেন। সরকারি পদে থাকা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত পদক্ষেপ নিলে শিদলাই ইউনিয়ন ভূমি অফিসের অনিয়ম বন্ধ করা সম্ভব হবে বলে আশা করছেন স্থানীয়রা।

নিউজটি আপনার স্যোসাল নেটওয়ার্কে শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Many players prefer ultra casino because of its balance between functionality and simplicity. Avoiding overly complex menus helps users stay focused on games. This is particularly important for mobile casino players using smaller screens.