সংগ্রাম থেকে সম্মানের শিখরে — দেলোয়ার হোসেনের জীবনগাথা

লোহাগাড়া চট্টগ্রাম জেলা প্রতিনিধি:

গ্রামের মেঠোপথে হাঁটতে হাঁটতে আজও কেউ যদি জানতে চায়, “সংগ্রাম কাকে বলে?”—তবে অনেকেই হয়তো একটি নাম উচ্চারণ করবে, দেলোয়ার হোসেন।
আমি এমন এক পরিবারের সন্তান, যেখানে সুখ-দুঃখ, ভালোবাসা আর পরীক্ষার গল্প একসঙ্গে মিশে আছে। আমার বাবা, মরহুম জাগির মিয়া সওদাগর, ছিলেন গ্রামের একজন সম্মানিত মানুষ। আল্লাহ তাঁকে ধন-সম্পদ দিয়েছিলেন—বাজারে দোকান, চাষাবাদের জমি, পুকুর এবং মানুষের সম্মান। কিন্তু পৃথিবীর নিয়ম বড় নির্মম। একদিন বাবা চলে গেলেন না-ফেরার দেশে, রেখে গেলেন বিশাল দায়িত্ব আর অনিশ্চয়তায় ভরা ভবিষ্যৎ।
আমি ছিলাম ছোট স্ত্রীর বড় ছেলে। আমার মা শামসুন্নাহার বেগম ছিলেন একজন অসাধারণ ধৈর্যশীলা নারী। স্বামীর মৃত্যুর পর সংসারের ভার যেন পাহাড় হয়ে তাঁর কাঁধে এসে পড়ল। চোখের জল লুকিয়ে, নিজের সুখ বিসর্জন দিয়ে তিনি তিন ছেলে আর পাঁচ মেয়েকে মানুষ করার সংগ্রামে নেমে পড়লেন।
মা আমাকে অন্য সবার চেয়ে একটু বেশি আদর করতেন। কারণ তিনি জানতেন, এই ছেলেটিই একদিন সংসারের হাল ধরবে। সেই বিশ্বাস দেলোয়ার কখনো ভাঙেননি।
জীবনের পথ মোটেও সহজ ছিল না। সৎ মায়ের সন্তানদের কাছ থেকে নানা কষ্ট, অবহেলা আর প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। অনেক সময় অন্যায়ের ভার এতটাই কঠিন ছিল যে বুক ভেঙে কান্না আসত। কিন্তু আমি প্রতিশোধের পথ বেছে নেননি। আমি ধৈর্য ধরেছি, পরিশ্রম করেছি এবং আল্লাহর ওপর ভরসা রেখেছি।
বাবার মৃত্যুর পর ছোট ছোট বোনদের চোখে আমি শুধু বড় ভাই ছিলাম না—আমি ছিলাম বাবার ছায়া। বোনদের প্রতিটি আবদার পূরণ করার চেষ্টা করেছি নিজের সাধ্যের শেষটুকু দিয়ে। কত রাত নির্ঘুম কেটেছে, কত স্বপ্ন বিসর্জন দিতে হয়েছে—তার হিসাব কেউ জানে না। কিন্তু একে একে পাঁচ বোনের বিয়ে দিয়েছি সম্মানের সঙ্গে। আজ সবাই নিজ নিজ সংসারে সুখে-শান্তিতে আছে। এটাই তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জনগুলোর একটি।
জীবিকার জন্য আমি গড়ে তুলেছি একটি মিষ্টির দোকান। সততা, পরিশ্রম আর মানুষের প্রতি আন্তরিক আচরণ আমাকে মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে দিয়েছে। পাশাপাশি আমি সমাজসেবার পথও বেছে নিয়েছি। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের পুটিবিলা ইউনিয়নের সাবেক সদস্য সচিব হিসেবে মানুষের পাশে থেকেছি সুখে-দুঃখে।
আজ আমি তিন ছেলে ও এক মেয়ের জনক। আমার সহধর্মিণী সাদিয়া আক্তার জীবনের প্রতিটি কঠিন সময়ে তাঁর পাশে থেকেছি শক্তির উৎস হয়ে।
আল্লাহর অশেষ রহমত এবং মা-বাবার দোয়ার বরকতে আজ আমি নিজের একটি বাড়ি নির্মাণ করেছি। সমাজে আমি সম্মানিত একজন মানুষ। মানুষ আমাকে ভালোবাসে, শ্রদ্ধা করে, আমার কথা মনোযোগ দিয়ে শোনে। কিন্তু আমি কখনো ভুলে যাননি সেই কষ্টের দিনগুলো, যখন আমার মা না খেয়ে সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দিয়েছেন।
আমি যখন মায়ের দিকে তাকায়, তখন তাঁর চোখ ভিজে ওঠে। তিনি মনে মনে বলেন—
“আমার জীবনের সবচেয়ে বড় সম্পদ জমি-জমা নয়, বাজারের দোকান নয়, পুকুর নয়। আমার সবচেয়ে বড় সম্পদ আমার মা। আমার ত্যাগ, আর দোয়া আর আমার চোখের অশ্রুই আমাকে আজকের অবস্থানে নিয়ে এসেছে।”
আমি বিশ্বাস করি, মানুষের সম্মান টাকা দিয়ে কেনা যায় না। সম্মান অর্জন করতে হয় সততা, পরিশ্রম, ধৈর্য এবং মা-বাবার দোয়া দিয়ে।
জীবনের শেষ প্রান্তে পৌঁছেও যদি কেউ তাঁর পরিচয় জানতে চায়, তিনি হয়তো বলবেন—
“আমি দেলোয়ার হোসেন। আমি কোনো রাজা নই, কোনো বড় ব্যবসায়ী নই। আমি একজন সংগ্রামী মানুষের সন্তান। একজন মায়ের স্বপ্ন পূরণের গল্প। একজন ভাইয়ের দায়িত্ব পালনের গল্প। একজন স্বামীর ভালোবাসার গল্প। একজন বাবার স্বপ্নের গল্প। আর সর্বোপরি, আল্লাহর অশেষ রহমত আর মা-বাবার দোয়ার জীবন্ত সাক্ষী।”
এই গল্প শুধু একজন মানুষের নয়; এটি সেই সব মায়েদের গল্প, যারা নিজের কষ্ট লুকিয়ে সন্তানদের মানুষ করেন। এটি সেই সব বড় ভাইদের গল্প, যারা বাবার অনুপস্থিতিতে পুরো পরিবারের আশ্রয় হয়ে ওঠেন। আর এটি সেই বিশ্বাসের গল্প, যেখানে ধৈর্য, পরিশ্রম এবং আল্লাহর ওপর ভরসা একদিন মানুষকে সম্মান ও মর্যাদার আসনে পৌঁছে দেয়।
আল্লাহ তাআলা মরহুম জাগির মিয়া সওদাগরকে জান্নাতুল ফিরদাউস নসিব করুন, শামসুন্নাহার বেগমকে সুস্থতা ও দীর্ঘ নেক হায়াত দান করুন এবং আমি দেলোয়ার হোসেন আমার পরিবারকে ঈমান, সম্মান ও বরকতে পরিপূর্ণ জীবন দান করুন। আমীন।,,,

“মায়ের চোখের জল”
: বাবার ছায়া
ভোরের কুয়াশা তখনও পুরোপুরি কাটেনি। গ্রামের মসজিদ থেকে ফজরের আজান ভেসে আসছে। দূরে ধানের ক্ষেতে শিশির ঝিলমিল করছে। বাঁশঝাড়ের ফাঁক দিয়ে সূর্যের প্রথম আলো যেন আল্লাহর রহমতের মতো নেমে আসছে পৃথিবীর বুকে। পাখির ডাক, গরুর ঘণ্টার শব্দ, আর কাঁচা রাস্তা ধরে মানুষের হাঁটার আওয়াজে জেগে উঠছে পুরো গ্রাম।
এই গ্রামেরই এক সম্মানিত পরিবার—মরহুম জাগির মিয়া সওদাগরের পরিবার।
আল্লাহ বাবাকে অঢেল সম্পদ দিয়েছিলেন। বাজারে একের পর এক দোকান, বিস্তীর্ণ চাষের জমি, বড় বড় পুকুর—সবই ছিল তাঁর। গ্রামের মানুষ সম্মানের সঙ্গে তাঁর নাম উচ্চারণ করত। কিন্তু পৃথিবীর কোনো সম্পদই মৃত্যুকে আটকাতে পারে না।
একদিন হঠাৎ করেই তিনি চলে গেলেন না-ফেরার দেশে।
সেদিন যেন শুধু একজন মানুষ মারা যাননি; ভেঙে পড়েছিল একটি পরিবারের আকাশ।
সেদিন ছোট্ট দেলোয়ার বুঝতে পারেনি, কেন মানুষ এত কাঁদছে। কেন তাঁর মায়ের বুকফাটা আর্তনাদে পুরো আকাশ ভারী হয়ে উঠেছে।
“ও আল্লাহ… আমার এতগুলো সন্তান নিয়ে আমি এখন কোথায় যাব?”
মা শামসুন্নাহার বেগমের সেই কান্না আজও যেন গ্রামের বাতাসে ভেসে বেড়ায়।
সেদিন থেকেই বদলে গেল সবকিছু।
যে উঠোনে একসময় হাসির শব্দ শোনা যেত, সেখানে নেমে এল নীরবতা। যে ঘরে বাবা বসে সবার খোঁজ নিতেন, সেই ঘরের দরজায় শুধু স্মৃতি দাঁড়িয়ে রইল।
দেলোয়ার তখনও তরুণ। কিন্তু সেদিন থেকেই তাঁর শৈশব শেষ হয়ে গেল।
তিনি আর শুধু বড় ছেলে নন…
আমি হয়ে গেলেন বাবার ছায়া।
মায়ের দিকে তাকিয়ে আমি বুঝে ফেললাম—এখন আর কান্না করার সময় নেই। এখন দাঁড়িয়ে থাকার সময়।
সংসারে তিন ভাই, পাঁচ বোন। ছোট ছোট বোনগুলো আমার দিকে এমনভাবে তাকাত, যেন বাবাই ফিরে এসেছেন।
“ভাইয়া, তুমি তো আছো… তাই না?”
এই একটি প্রশ্নই আমার বুকের ভেতর আগুন জ্বালিয়ে দিত।
আমি মনে মনে বলতাম,
“হ্যাঁ, আমি আছি। যতদিন বেঁচে আছি, তোদের চোখে পানি আসতে দেব না।”
কিন্তু জীবন এত সহজ ছিল না।
মানুষ ভাবে, সম্পদ থাকলেই বুঝি সুখ থাকে।
কিন্তু সম্পদের চেয়ে বড় ছিল মানুষের লোভ।
বাবার মৃত্যুর পর শুরু হলো সম্পত্তি নিয়ে টানাপোড়েন। সৎ মায়ের ছেলেদের আচরণ ধীরে ধীরে বদলে গেল। অপমান, অবহেলা, কষ্ট—সবকিছু যেন একসঙ্গে নেমে এল।
অনেক রাত এমন গেছে, যখন মা শামসুন্নাহার বেগম নামাজের সিজদায় পড়ে শুধু কেঁদেছেন।
“হে আল্লাহ… আমার সন্তানদের তুমি রক্ষা করো।”
আমি দূরে দাঁড়িয়ে মায়ের কান্না দেখতাম।
নিজের চোখের জল তিনি লুকিয়ে রাখতেন।
কারণ তিনি জানতেন—
বড় ছেলেরা কাঁদতে পারে না।
তারা কাঁদলে পুরো পরিবার ভেঙে পড়ে।
দিনে কাজ, রাতে চিন্তা।
কখনো বাজারে, কখনো জমিতে, কখনো মানুষের দ্বারে।
শুধু একটি স্বপ্ন—
“আমার বোনদের মাথা যেন কখনো নিচু না হয়।”
এক এক করে পাঁচ বোনের বিয়ে দিলাম।
কেউ জানল না, কত রাত আমি না ঘুমিয়ে কাটিয়েছেন।
কেউ জানল না, কত ইচ্ছা তিনি কবর দিয়েছেন বোনদের হাসিমুখ দেখার জন্য।
বিয়ের দিন বিদায়ের সময় এক বোন আমার গলা জড়িয়ে ধরে বলেছিল—
“ভাইয়া… তুমি না থাকলে আজ আমি এই ঘর থেকে কনে হয়ে বের হতে পারতাম না।”
সেদিন প্রথমবার আমি সবার অগোচরে কেঁদেছিলাম।
সেদিন আমার মনে হয়েছিল—
বাবা হয়তো আকাশ থেকে তাকিয়ে বলছেন,
“বাবা, আজ আমি তোমার ওপর গর্বিত।”
সময়ের চাকা থেমে থাকেনি।
আমি নিজের পরিশ্রমে গড়ে তুললাম একটি মিষ্টির দোকান।
সততা ছিল আমার মূলধন।
মানুষ শুধু মিষ্টি কিনতে আসত না।
আসত আমার হাসিমুখ দেখতে।
আসত আামার আন্তরিকতা অনুভব করতে।
ধীরে ধীরে সমাজও আমাকে আপন করে নিল।
আনি হলাম বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের পুটিবিলা ইউনিয়নের সাবেক সদস্য সচিব।
মানুষের সুখে-দুঃখে পাশে দাঁড়ানোই হয়ে উঠল আমার পরিচয়।
এদিকে আমার জীবনসঙ্গী সাদিয়া আক্তার নীরবে তাঁর সংগ্রামের সাথী হয়ে রইলেন।
আল্লাহআমাদের ঘর আলোকিত করলেন তিন ছেলে ও এক মেয়ের মাধ্যমে।
অনেক ঝড়ঝাপটার পর একদিন যখন নিজের নতুন বাড়ির সামনে দাঁড়ালাম আমি, তখন তাঁর চোখ চলে গেল মায়ের দিকে।
মা বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছেন।
চোখে জল।
ঠোঁটে হাসি।
আমার আমমুর হাত ধরে বললাম
“মা… আজ যদি বাবা বেঁচে থাকতেন…”
মা আর কথা বলতে পারলেন না।
শুধু আমার মাথায় হাত রেখে বললেন—
“বাবা… আজ আমি গরিব নই। আমার সবচেয়ে বড় সম্পদ তুই।”
সেদিন আমি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলাম না
মায়ের পায়ে মাথা রেখে আমি শিশুর মতো কেঁদে বললাম।
চারদিকে নীরবতা।
শুধু মা আর ছেলের কান্নার শব্দ।
আকাশটাও যেন সেদিন কেঁদেছিল।
কারণ পৃথিবীর সব যুদ্ধ জয় করা যায়।
কিন্তু মায়ের চোখের এক ফোঁটা জল—সেটার দাম কোনো সম্পদ দিয়ে শোধ করা যায় না।
সেদিন গ্রামের এক বৃদ্ধ ধীরে ধীরে বলেছিলেন—
“যে ছেলে মায়ের চোখের জল মুছে দিতে পারে, আল্লাহ তাকে একদিন মানুষের হৃদয়ের রাজা বানিয়ে দেন।”

নিউজটি আপনার স্যোসাল নেটওয়ার্কে শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Many players prefer ultra casino because of its balance between functionality and simplicity. Avoiding overly complex menus helps users stay focused on games. This is particularly important for mobile casino players using smaller screens.