
নিজস্ব প্রতিবেদক:
দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করা শিশু রামিসা আক্তার ধর্ষণ ও হত্যা মামলার বিচারিক আদালতের কার্যক্রম দ্রুত শেষ হলেও উচ্চ আদালতে এসে আটকে আছে পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া। নিম্ন আদালতে মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণার পর ডেথ রেফারেন্স ও আসামিদের আপিল শুনানি এখনো শুরু হয়নি।
মামলাটি দ্রুত নিষ্পত্তির দাবিতে দেশজুড়ে প্রতিবাদ ও ন্যায়বিচারের দাবি ওঠে। এর পরিপ্রেক্ষিতে বিচারিক আদালতে অল্প সময়ের মধ্যে মামলার বিচারিক কার্যক্রম শেষ করে রায় ঘোষণা করা হয়। এতে মামলার প্রধান আসামি মো. সোহেল রানা ও তাঁর স্ত্রী স্বপ্না খাতুনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।
রায়ের দুই দিন পরই মামলার নথি উচ্চ আদালতে পাঠানো হয়। প্রধান বিচারপতির নির্দেশনায় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে মামলাটির পেপারবুকও প্রস্তুত করা হয়। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের অধীনে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির লক্ষ্যে হাইকোর্টে বিশেষ বেঞ্চ গঠন করা হয়েছে। ওই বেঞ্চ ইতোমধ্যে ২৪টি মামলা নিষ্পত্তি করেছে বলে জানিয়েছেন রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল।
বর্তমানে সুপ্রিম কোর্টে অবকাশকালীন ছুটি চলছে। অ্যাটর্নি জেনারেল আশা প্রকাশ করেছেন, আগামী ২৫ অক্টোবর আদালতের কার্যক্রম শুরু হলে চলতি বছরের মধ্যেই রামিসা হত্যা মামলার আপিল ও ডেথ রেফারেন্সের শুনানি সম্পন্ন হতে পারে।
ঢাকা পোস্টকে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে দ্রুততম সময়ে তদন্ত শেষ করে নিম্ন আদালতে বিচার সম্পন্ন হওয়ার ক্ষেত্রে রামিসা হত্যা মামলা উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। হত্যাকাণ্ডের পর সরকারপ্রধান ভুক্তভোগীর বাড়িতে গিয়ে পরিবারকে আশ্বস্ত করেছিলেন এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।
উচ্চ আদালতে শুনানি বিলম্বের বিষয়ে তিনি বলেন, আইন অনুযায়ী দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার জন্য ৬০ দিনের সময় রয়েছে। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর ২৮ ধারা অনুযায়ী ক্ষুব্ধ পক্ষ ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে হাইকোর্টে আপিল করতে পারেন। দণ্ডপ্রাপ্তদের এই আইনি অধিকার নিশ্চিত করার জন্য ওই সময়সীমা শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা হয়েছে।
অ্যাটর্নি জেনারেল আরও জানান, বিচারিক আদালতে দ্রুত বিচার শেষ হওয়ার পর মামলাটি ডেথ রেফারেন্স হিসেবে হাইকোর্টে আসে। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পেপারবুকও প্রস্তুত করা হয়েছে। এরই মধ্যে সোহেল রানা ও তাঁর স্ত্রী স্বপ্না খাতুনের দুটি জেল আপিলও মঞ্জুর হয়েছে। মামলাটি শুনানির তালিকায় যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল বলেও জানান তিনি।
তিনি বলেন, রামিসা হত্যাকাণ্ডের পর প্রধান বিচারপতি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের অধীনে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত মামলাগুলোর শুনানির জন্য বিশেষ বেঞ্চ গঠন করেন। ওই বেঞ্চ গঠনের পর জুন থেকে হাইকোর্টে অন্তত ২৪টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। এর মধ্যে মাগুরার আছিয়া হত্যা মামলা ও ফেনীর মাদরাসাছাত্রী নুসরাত হত্যা মামলাও রয়েছে। রামিসা হত্যা মামলাটিও ওই বেঞ্চের শুনানির তালিকায় রয়েছে।
অ্যাটর্নি জেনারেলের আশা, ২৫ অক্টোবর আদালতের অবকাশ শেষ হওয়ার পর ১৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত আদালতের কার্যক্রম চলাকালে মামলাটি শুনানির জন্য তালিকায় আসতে পারে। শুনানি সম্পন্ন হলে ২০২৬ সালের মধ্যেই উচ্চ আদালতের আপিল ও ডেথ রেফারেন্সের প্রক্রিয়া শেষ করা সম্ভব হতে পারে।
মামলার অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, ভুক্তভোগী রামিসা আক্তার (৮) পপুলার মডেল হাই স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী ছিল। চলতি বছরের ১৯ মে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে বাড়ি থেকে বের হলে আসামি স্বপ্না আক্তার কৌশলে তাকে নিজের ফ্ল্যাটের একটি কক্ষে নিয়ে যান।
সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রামিসাকে স্কুলে যাওয়ার জন্য খোঁজাখুঁজি শুরু করেন স্বজনরা। একপর্যায়ে আসামির কক্ষের সামনে রামিসার জুতা দেখতে পান তারা। ডাকাডাকি করে কোনো সাড়া না পেয়ে পরিবারের সদস্য ও ফ্ল্যাটের অন্য বাসিন্দারা দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেন। সেখানে মেঝেতে রামিসার মস্তকবিহীন মরদেহ এবং কক্ষের ভেতরে একটি বড় বালতির মধ্যে তাঁর মাথা পাওয়া যায়।
ঘটনাস্থলে স্বপ্না আক্তারকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে স্বজনরা তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। মামলার অভিযোগে বলা হয়, তখন স্বপ্না জানান, তাঁর স্বামী মো. সোহেল রানা রামিসাকে বাথরুমে আটকে রেখে ধর্ষণ এবং পরে গলা কেটে হত্যা করেন।
এ ঘটনায় ১৯ মে রামিসার বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা বাদী হয়ে পল্লবী থানায় সোহেল রানা ও স্বপ্না আক্তারকে আসামি করে মামলা করেন। পরে স্বপ্নাকে গ্রেপ্তার করা হয়। সোহেল রানাকে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
২০ মে সোহেল রানা আদালতে দোষ স্বীকার করে জবানবন্দি দেন। একই দিন তাঁর স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে কারাগারে পাঠানো হয়। পরে ২৪ মে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পল্লবী থানার এসআই অহিদুজ্জামান দুই আসামিকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন।
অভিযোগপত্র আমলে নিয়ে মামলাটি বিচারের জন্য ঢাকার শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালে পাঠানো হয়। ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন অভিযোগপত্র আমলে নিয়ে অভিযোগ গঠনের জন্য ১ জুন দিন ধার্য করেন।
১ জুন দুই আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেওয়া হয়। পরদিন একদিনেই রামিসার বাবা-মা, বোন, প্রত্যক্ষদর্শী, সুরতহাল প্রতিবেদনের সাক্ষী, চিকিৎসক, ম্যাজিস্ট্রেট ও তদন্ত কর্মকর্তাসহ মোট ১৬ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়।
৩ জুন আসামিদের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হয়। এ সময় সোহেল রানা নিজের দোষ স্বীকার করে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। তবে তাঁর স্ত্রী স্বপ্না নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন।
৪ জুন রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। রাষ্ট্রপক্ষ আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের দাবি জানায়। অন্যদিকে আসামিপক্ষ যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আবেদন করে।
বিচারিক কার্যক্রমের সব ধাপ শেষ হওয়ার পর ৭ জুন রায়ের দিন ধার্য করা হয়। ওই দিন ঢাকার মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন সোহেল রানা ও স্বপ্না খাতুনকে মৃত্যুদণ্ড দেন। পাশাপাশি সোহেল রানাকে পাঁচ লাখ টাকা এবং স্বপ্না খাতুনকে দুই লাখ টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়।
আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, অর্থদণ্ডের টাকা ভুক্তভোগী রামিসার আইনগত উত্তরাধিকারীরা পাবেন। অর্থদণ্ড পরিশোধে ব্যর্থ হলে আসামিদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি নিলামে বিক্রি করে তা আদায়ের নির্দেশ দেওয়া হয়।
৯ জুন মামলার পূর্ণাঙ্গ রায়সহ ৬৯ পৃষ্ঠা এবং দুই আসামির মৃত্যুদণ্ডের ডেথ রেফারেন্সসংক্রান্ত তিন পৃষ্ঠাসহ মোট ৭২ পৃষ্ঠার নথি হাইকোর্টে পাঠানো হয়।
আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, হত্যার আগে রামিসাকে ধর্ষণ ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত করার প্রমাণ পাওয়া গেছে। সোহেল রানা স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেওয়ার পর তা প্রত্যাহারের আবেদন করেননি। আদালতের পর্যবেক্ষণে আরও বলা হয়, স্বপ্না তাঁর স্বামীকে পালাতে সহযোগিতা করেছেন এবং অপরাধ প্রতিরোধে কার্যকর কোনো ভূমিকা নেননি।
বিচারিক আদালতে দ্রুত বিচার ও রায় ঘোষণার পর এখন উচ্চ আদালতের শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে বহুল আলোচিত এ মামলা। আগামী ২৫ অক্টোবর আদালতের অবকাশ শেষ হলে মামলাটির ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের শুনানি শুরু হয় কি না, সেদিকেই নজর সংশ্লিষ্টদের।### শিশু রামিসা ধর্ষণ ও হত্যা মামলা, উচ্চ আদালতে থমকে আছে বিচার

Leave a Reply