গুমের নাটক সাজিয়ে ২ বছর আত্মগোপন: নির্দোষ ঠিকাদারকে ৪ মাস জেল খাটিয়ে অবশেষে জীবিত উদ্ধার


​কটিয়াদী(কিশোরগঞ্জ)প্রতিনিধি:
কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচরে প্রায় দুই বছর ধরে পরিকল্পিতভাবে আত্মগোপনে থেকে নিজের ‘অপহরণ, হত্যা ও লাশ গুমের’ মিথ্যা মামলা করানোর এক দুর্ধর্ষ প্রতারণার ঘটনা ফাঁস করেছে পুলিশ। এই সাজানো মামলার জালে ফেঁসে প্রধান আসামি হিসেবে টানা চার মাস কারাভোগ করেছেন জামান মিয়া নামের এক স্থানীয় ঠিকাদার।
অবশেষে দীর্ঘ তদন্ত ও আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় গাজীপুর থেকে তথাকথিত ‘নিখোঁজ’ যুবক মোস্তফা কামালকে (২৮) জীবিত ও সুস্থ অবস্থায় উদ্ধার করেছে কুলিয়ারচর থানা পুলিশ।

​শনিবার (১১ জুলাই) বিকেলে কুলিয়ারচর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কাজী আরিফ উদ্দিন ঘটনাটির সত্যতা নিশ্চিত করার পর পুরো এলাকায় ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে।

​বিরোধের সূত্রপাত ও নিখোঁজ নাটক
​অনুসন্ধানে জানা যায়, উদ্ধার হওয়া মোস্তফা কামাল মূলত ময়মনসিংহের শেরপুর জেলার বাসিন্দা হলেও তার পরিবার কুলিয়ারচরের লক্ষ্মীপুর এলাকায় নানাবাড়িতে বসবাস করত। পেশায় রাজমিস্ত্রি কাম সাব-কন্ট্রাক্টর মোস্তফা কামালের সাথে বাজিতপুরের পিরিজপুর এলাকার ঠিকাদার জামান মিয়ার ব্যবসায়িক সুবাদে পরিচয় হয়। একসাথে কাজ করার সময় তাদের মধ্যে কয়েক লাখ টাকার আর্থিক লেনদেন নিয়ে বড় ধরনের বিরোধ তৈরি হয়।

​ঠিকাদার জামান মিয়ার দাবি, মোস্তফা কামাল কাজের হিসাবের বাইরে তার কাছ থেকে প্রায় চার লাখ টাকা অতিরিক্ত অগ্রিম নিয়ে আর কাজে আসেননি। পাওনা টাকা ফেরত চাওয়াকে কেন্দ্র করে বিরোধ চরমে পৌঁছালে মোস্তফা কামাল একপর্যায়ে সুকৌশলে বাড়ি ছেড়ে উধাও হয়ে যান এবং পরিবারের সাথেও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।

এদিকে ​ছেলে নিখোঁজ হওয়ার পর তার মা মনোয়ারা বেগম আদালতে একটি পিটিশন মামলা দায়ের করেন। মামলায় অভিযোগ করা হয়— ঠিকাদার জামান মিয়া ও তার সহযোগীরা মোস্তফা কামালকে অপহরণের পর হত্যা করে লাশ গুম করেছে। আদালতের নির্দেশে পরবর্তীতে কুলিয়ারচর থানায় মামলাটি রুজু হয় এবং পুলিশ প্রধান আসামি জামান মিয়াকে গ্রেফতার করে।

​নির্দোষ জামান মিয়া শুরু থেকেই তাকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোর দাবি জানিয়ে আসলেও দীর্ঘ চার মাস তাকে কারাগারে বন্দি থাকতে হয়। পরবর্তীতে উচ্চ আদালত থেকে জামিনে মুক্তি পান তিনি।

জামান মিয়া ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “এই মিথ্যা মামলার কারণে আমার ব্যবসা, সামাজিক মর্যাদা এবং পরিবারের অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে। আমি এই ষড়যন্ত্রকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।”

​মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও কুলিয়ারচর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মফিজুল হক জানান, মামলার তদন্ত করতে গিয়ে শুরু থেকেই বিভিন্ন তথ্য ও সাক্ষ্য-প্রমাণে বেশ কিছু অসঙ্গতি তাদের নজরে আসে। বিষয়টি সন্দেহজনক মনে হওয়ায় পুলিশ তথ্যপ্রযুক্তির নজরদারি বৃদ্ধি করে।

অবশেষে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে গত বৃহস্পতিবার রাতে গাজীপুরের গাছা থানার ভোগড়াচালা এলাকার একটি ভাড়া বাসায় অভিযান চালায় পুলিশ। সেখান থেকেই সম্পূর্ণ সুস্থ ও জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করা হয় মোস্তফা কামালকে।

জানা গেছে, সেখানে তিনি স্বাভাবিকভাবে রাজমিস্ত্রির কাজ করার পাশাপাশি নতুন করে বিয়ে করে সংসারও করছিলেন।

​মিথ্যা গুমের ঘটনাটি ফাঁস হওয়ার পর ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল। লক্ষ্মীপুর এলাকার বাসিন্দা আবদুল কাদের জানান, “আমরা ভেবেছিলাম ছেলেটি সত্যিই খুনের শিকার হয়েছে। এখন জানা গেল সব নাটক। যারা এভাবে মিথ্যা মামলা দিয়ে নির্দোষ মানুষকে হয়রানি করে, তাদের কঠিন শাস্তি হওয়া দরকার।”

​কুলিয়ারচর থানার ওসি কাজী আরিফ উদ্দিন জানান, উদ্ধার হওয়া যুবককে আদালতে হাজির করে তার জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, “পুরো এই ষড়যন্ত্রের পেছনে আর কারা জড়িত এবং পরিবারের সদস্যরা জেনেশুনে তদন্তকারীদের বিভ্রান্ত করেছে কি না— তা কঠোরভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্ত শেষে অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

নিউজটি আপনার স্যোসাল নেটওয়ার্কে শেয়ার করুন

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *