বিদেশফেরত যুবক সবুজ আজ প্রতিবন্ধী: একটি কৃত্রিম পায়ের অপেক্ষায় নতুন জীবনের স্বপ্ন

সদরপুর উপজেলা প্রতিনিধি:সদরপুর উপজেলার এক সাধারণ পরিবারের ছেলে সবুজ। পুরো নাম হয়তো অনেকেই জানেন না, কিন্তু এলাকার মানুষ তাকে চিনতেন ‘সবুজ’ নামেই। তার মা জবেদা বেগমকে সবাই ডাকতেন ‘সবুজের মা’ বলে। সেই পরিচয়েই তিনি পরিচিত ছিলেন আমাদের পরিবারেও। ছোটবেলা থেকে সবুজকে দেখেছি। মায়ের সঙ্গে প্রায়ই আমাদের বাড়িতে আসত সে। চঞ্চল, হাসিখুশি আর ভদ্র স্বভাবের একটি ছেলে ছিল সবুজ।

তাদের পরিবারটি ছিল অভাব-অনটনের সঙ্গে লড়াই করা একটি সাধারণ পরিবার। সংসারে ছিল নানা কষ্ট, নানা সীমাবদ্ধতা। তবুও স্বপ্ন দেখা থেমে থাকেনি। পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর স্বপ্ন নিয়ে বড় হয়েছিল সবুজ। তার একটি বড় বোন ছিল, নাম বেবি। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে বেবি আজ আর পৃথিবীতে নেই। পরিবারের একের পর এক দুঃখ-কষ্টের মাঝেও জীবনযুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছিল সবুজ।

একসময় সংসারের হাল ধরতে বিদেশেও পাড়ি জমিয়েছিল সে। হাজারো তরুণের মতো সেও স্বপ্ন দেখেছিল নিজের ভাগ্য পরিবর্তনের। বিদেশে কষ্ট করে উপার্জন করে পরিবারকে স্বচ্ছল করার ইচ্ছা ছিল তার। কিন্তু মানুষের জীবনে কখন কোন ঘটনা অপেক্ষা করে থাকে, তা কেউ জানে না।

সম্প্রতি সদরপুর উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত একটি সরকারি অনুষ্ঠানে বহুদিন পর হঠাৎ দেখা হয়ে গেল সবুজের সঙ্গে। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক। বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কার্যক্রমের পাশাপাশি সেখানে উপকারভোগীদের মাঝে বিভিন্ন সরকারি সেবা ও সহায়তা প্রদান করা হচ্ছিল। এর মধ্যে প্রতিবন্ধী নাগরিকদের জন্য ‘সুবর্ণ নাগরিক কার্ড’ বিতরণও ছিল।

অনুষ্ঠান শেষে হলরুম থেকে বের হয়ে আসছিলাম। এমন সময় পেছন থেকে একটি পরিচিত কণ্ঠ ভেসে এলো—

“মামা, কেমন আছেন?”

আমি থেমে গেলাম। কণ্ঠস্বরটি পরিচিত মনে হলেও মানুষটিকে চিনতে পারছিলাম না। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর সে আবার বলল—

“মামা, চিনতে পারছেন না? আমি সবুজ।”

কথাটি শুনে আমি বিস্মিত হয়ে গেলাম। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটি সেই সবুজ, কিন্তু তাকে যেন আগের মতো লাগছিল না। তার শারীরিক অবস্থার দিকে তাকিয়ে আমার মনে প্রশ্ন জাগল—

“তোমার এমন অবস্থা হলো কীভাবে?”

প্রশ্নের উত্তরে সবুজ জানাল, প্রায় দুই বছর আগে সদরপুর সোনালী ব্যাংকের সামনে একটি মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হয় সে। দুর্ঘটনায় তার ডান পা গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দীর্ঘদিন চিকিৎসা চললেও শেষ পর্যন্ত চিকিৎসকরা তার পা রক্ষা করতে পারেননি। জীবন বাঁচানোর জন্য হাঁটুর নিচ থেকে ডান পা কেটে ফেলতে হয়।

কথাগুলো বলতে গিয়ে সবুজের চোখে ছিল অসহায়ত্বের ছাপ। আর আমার চোখের সামনে ভেসে উঠছিল সেই ছোট্ট ছেলেটির মুখ, যে একসময় দৌড়ে বেড়াত, হাসত, স্বপ্ন দেখত। আজ সেই সবুজ একটি পা হারিয়ে জীবনের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে।

দুর্ঘটনার পর তার জীবন অনেকটাই বদলে গেছে। স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করা, কাজ করা, পরিবারের দায়িত্ব পালন করা—সবকিছুই হয়ে উঠেছে কঠিন। একজন কর্মক্ষম যুবক থেকে সে আজ শারীরিক প্রতিবন্ধিতার সঙ্গে লড়াই করা একজন মানুষ।

তবে সবুজ হার মানেনি। সে এখনও বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখে, স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চায়। চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী একটি উন্নতমানের কৃত্রিম পা লাগাতে পারলে সে আবার স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারবে, কাজ করতে পারবে, নিজের জীবনকে নতুন করে গড়ে তোলার সুযোগ পাবে।

কিন্তু সেই স্বপ্নের সামনে সবচেয়ে বড় বাধা অর্থ। একটি মানসম্মত কৃত্রিম পা সংযোজনের জন্য প্রয়োজন কয়েক লক্ষ টাকা। দরিদ্র পরিবারের পক্ষে এই ব্যয় বহন করা প্রায় অসম্ভব। ফলে অর্থের অভাবে তার চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের স্বপ্ন অনিশ্চয়তার মধ্যে ঝুলে আছে।

বাংলাদেশে অসংখ্য মানুষ মানবিক সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়ে অসহায় মানুষের জীবন বদলে দিয়েছেন। সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি, প্রবাসী বাংলাদেশি, সামাজিক সংগঠন এবং মানবিক হৃদয়ের মানুষদের সম্মিলিত উদ্যোগ একজন সবুজের জীবনকে নতুন করে আলোকিত করতে পারে।

আজকের এই আবেদন কোনো দান নয়, বরং একজন সংগ্রামী মানুষের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান। যে যুবক একসময় নিজের পরিবারকে সুখী করার জন্য বিদেশে গিয়েছিল, আজ সে নিজেই সমাজের সহযোগিতার প্রত্যাশী।

সবুজের গল্প শুধু একজন মানুষের গল্প নয়; এটি আমাদের সমাজের অনেক সংগ্রামী মানুষের গল্প, যারা দুর্ঘটনা, দারিদ্র্য ও প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে আছেন। তাদের পাশে দাঁড়ানো আমাদের সামাজিক ও মানবিক দায়িত্ব।

আসুন, আমরা সবাই মিলে সবুজের পাশে দাঁড়াই। একটি কৃত্রিম পা হয়তো তার হারিয়ে যাওয়া অঙ্গ ফিরিয়ে দিতে পারবে না, কিন্তু তাকে আবার হাঁটার শক্তি, বাঁচার সাহস এবং নতুন জীবনের স্বপ্ন ফিরিয়ে দিতে পারে।

ফী আমানিল্লাহ।

নিউজটি আপনার স্যোসাল নেটওয়ার্কে শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Many players prefer ultra casino because of its balance between functionality and simplicity. Avoiding overly complex menus helps users stay focused on games. This is particularly important for mobile casino players using smaller screens.