
এসএসসি ফলাফল বিপর্যয়, পাস ৪৪ শতাংশ

নিজস্ব প্রতিবেদক,রাঙ্গুনিয়াঃ
চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার সরফভাটা ইউনিয়ন উচ্চ বিদ্যালয়ে ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলে বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটেছে। এ বছর বিদ্যালয়টির সাধারণ শাখা থেকে ১৩৮ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিয়ে পাস করেছে মাত্র ৬২ জন। ফেল করেছে ৭৬ জন। ফলে পাসের হার দাঁড়িয়েছে ৪৪ দশমিক ৯৩ শতাংশে।
ঐতিহ্যবাহী এই বিদ্যালয়ের এমন ফলাফলে অভিভাবক, প্রাক্তন শিক্ষার্থী ও স্থানীয় সচেতন মহলের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তাদের দাবি, অতীতে বিদ্যালয়টির ফলাফল তুলনামূলক ভালো থাকলেও এবার পাসের হার অর্ধেকের কাছাকাছি নেমে আসার কারণ খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
বিদ্যালয়ের গত কয়েক বছরের ফলাফল পর্যালোচনা করে সংশ্লিষ্টরা জানান, ২০১৬ সালে প্রতিষ্ঠানটির পাসের হার ছিল ৮৮ দশমিক ৯৫ শতাংশ। সেই তুলনায় বর্তমান ফলাফলকে বড় ধরনের অবনমন হিসেবে দেখছেন স্থানীয়রা।
ফলাফল বিপর্যয়ের কারণ নিয়ে বিদ্যালয়ের একাডেমিক পরিবেশ, শিক্ষক কার্যক্রম এবং খণ্ডকালীন শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে বিভিন্ন অভিযোগ সামনে এসেছে। প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের একটি অংশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি করেছেন, বিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রমে অভ্যন্তরীণ নানা প্রভাব ও গ্রুপিংয়ের কারণে শিক্ষার পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
এ ছাড়া কোনো কোনো খণ্ডকালীন শিক্ষক নিয়োগে যথাযথ বিজ্ঞপ্তি ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে কি না—এ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন কেউ কেউ। বর্তমানে কর্মরত কয়েকজন খণ্ডকালীন শিক্ষকের নিয়োগ ও পাঠদানের দায়িত্ব নিয়েও অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, নির্দিষ্ট বিষয়ে নিয়োগ পাওয়া কোনো কোনো শিক্ষক সংশ্লিষ্ট বিষয়ের বাইরে অন্য বিষয়েও ক্লাস নিচ্ছেন। একই সঙ্গে কয়েকজন শিক্ষকের নিয়মিত পাঠদান, দায়িত্ব পালনের মান এবং শ্রেণিকক্ষে কার্যকর উপস্থিতি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক সূত্র।
এ ছাড়া বিদ্যালয়ের পরীক্ষাকালীন দায়িত্ব বণ্টন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। একই ব্যক্তিরা বারবার পরীক্ষার দায়িত্ব পাচ্ছেন কি না, দায়িত্ব বণ্টনে কোনো ধরনের বৈষম্য রয়েছে কি না—এসব বিষয়েও তদন্তের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক অঞ্জন বৈদ্য।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রধান শিক্ষক বলেন, বিদ্যালয়ের একাডেমিক কার্যক্রম রুটিন অনুযায়ী পরিচালিত হচ্ছে এবং শিক্ষকরা তাদের নির্ধারিত ক্লাস নিচ্ছেন। তিনি ক্লাস রুটিন দেখিয়ে বলেন, বিষয়টি যাচাই করে তিনি এ ধরনের কোনো তথ্য পাননি।
পরীক্ষাকেন্দ্রে দায়িত্ব বণ্টনে কোনো ধরনের সিন্ডিকেট বা একই ব্যক্তির বারবার দায়িত্ব পাওয়ার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রধান শিক্ষক বলেন, বিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ কেন্দ্রে অভিজ্ঞ ও নিবন্ধিত শিক্ষকদের রাখার চেষ্টা করা হয়। আর বাইরের কেন্দ্রের দায়িত্ব উপজেলা শিক্ষা অফিস থেকে নির্ধারণ করা হয়; সেখানে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কোনো এখতিয়ার নেই।
এবারের ফলাফল সম্পর্কে প্রধান শিক্ষক স্বীকার করেন, বিদ্যালয় কিছুটা পিছিয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, পরবর্তী সময়ে একাডেমিক কার্যক্রমের দুর্বলতা চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং ভালো ফলাফল করার জন্য আরও জোরালো উদ্যোগ নেওয়া হবে।
সদ্য এডহক কমিটির সভাপতি সালাউদ্দিন চৌধুরীর কাছে স্কুলের রেজাল্ট এবং একাডেমিক বিষয় জানতে চাইলে তিনি বলেন আমি এবিষয় গুলো শুনেছি,তবে মাত্র দায়িত্ব গ্রহণ করায় এখনো সব বিষয়ে উপলব্ধি করতে পারি নাই।যদি এধরনের কোনকিছু আমার নজরে আসে তা কঠোর হাতে দমন করবো। এবং যথাযথ কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলে ব্যবস্থা নিব।
তবে স্থানীয় অভিভাবক ও প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের দাবি, শুধু ফলাফল খারাপ হওয়ার বিষয়টি নয়—এর পেছনে কোনো প্রশাসনিক বা একাডেমিক দুর্বলতা রয়েছে কি না, তা নিরপেক্ষভাবে অনুসন্ধান করা জরুরি।
প্রাইভেট বানিজ্যের কারণে একাডেমিক পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে, এবং গরীব মেধাবী শিক্ষার্থীরা অর্থের অভাবে প্রাইভেট না পরায় রেজাল্ট খারাপ করছে।
তাদের মতে, শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া, খণ্ডকালীন শিক্ষকদের যোগ্যতা ও দায়িত্ব, নিয়মিত পাঠদান, পরীক্ষার দায়িত্ব বণ্টন এবং বিদ্যালয় পরিচালনা পর্ষদের ভূমিকা—সবকিছুই যাচাই করা প্রয়োজন।
শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের মতে, একটি প্রতিষ্ঠানের ফলাফল এক বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেলে তার কারণ শুধু শিক্ষার্থীদের দুর্বলতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে শিক্ষকতা, পাঠদান পদ্ধতি, একাডেমিক তদারকি, অভিভাবক-বিদ্যালয় যোগাযোগ এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনাসহ সামগ্রিক বিষয় পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
এ অবস্থায় সরফভাটা ইউনিয়ন উচ্চ বিদ্যালয়ের এবারের ফলাফল বিপর্যয়ের প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে উপজেলা ও জেলা শিক্ষা কর্তৃপক্ষের নজরদারি বাড়ানোর দাবি উঠেছে। একই সঙ্গে খণ্ডকালীন শিক্ষক নিয়োগ ও একাডেমিক কার্যক্রম নিয়ে ওঠা অভিযোগগুলো যাচাই করে সত্যতা পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
তবে অভিযোগগুলোর সত্যতা এখনো স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়নি। বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষও এসব অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছে। ফলে প্রকৃত কারণ জানতে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা কর্তৃপক্ষের নিরপেক্ষ তদন্তই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।