

বিশেষ প্রতিনিধিঃ
ফ্যাসিবাদী জল্লাদ সরকারের অন্যতম প্রধান লাঠিয়াল, সীমাহীন দুর্নীতি, লম্পটতা ও পাশবিকতার জীবন্ত নরকখণ্ড পুলিশ কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলমগীর হোসেনের গা শিউরে ওঠা আমলনামা ফাঁস হয়েছে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে নির্বিচারে ছাত্র-ছাত্রী ও সাধারণ মানুষকে পাখির মতো গুলি করে ঝাঁঝরা করা, ব্যবসায়ীকে গুমের চেষ্টা, খোদ থানার ভেতরেই অসহায় নারীকে পৈশাচিক ধর্ষণ এবং নিরীহ মানুষের চোখ কলম দিয়ে খুঁচিয়ে উপড়ে অন্ধ করার মতো মধ্যযুগীয় বর্বরতার মূল হোতা এই আলমগীর। চরম চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো, সরকারি তদন্তে এই পিশাচের সমস্ত জঘন্য অপরাধ হাতেনাতে প্রমাণিত হওয়ার পর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পাবলিক সার্ভিস কমিশন (পিএসসি) কর্তৃক তাকে চাকরি থেকে চূড়ান্ত “বরখাস্ত” (Dismissal from service) করার সুপারিশ করার পরও এই নরপশুর গায়ের একটা পশমও কেউ স্পর্শ করতে পারেনি।
এর পেছনে রয়েছে এক চরম রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক আঁতাত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক বিতর্কিত ছাত্রলীগ নেতা হওয়ার সুবাদে এবং সেই ‘ক্যাডার কোটার’ অন্ধ প্রভাবে আলমগীরের খুঁটির জোর ছিল আকাশচুম্বী। আর এই সুযোগে আইন ও নিয়মনীতিকে সম্পূর্ণ বুড়ো আঙুল দেখিয়ে তার ত্রাতা হিসেবে অবতীর্ণ হন বিগত খুনী সরকারের সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এবং সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান। এই প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের সরাসরি আশীর্বাদ ও ক্ষমতার কালো থাবায় চাকুরীতে পুনর্বহাল করা হয় এই চিহ্নিত অপরাধীকে। শুধু পুনর্বহালই নয়, উপহার হিসেবে দেওয়া হয় পর পর দুইটি জবরদস্ত পদোন্নতি! স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কামাল ও ডিএমপি কমিশনার হাবিবের প্রত্যক্ষ মদদে ডিএমপির ‘ডিসি ক্রাইম’-এর মতো অতি গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর পদ ভাগিয়ে নিয়ে বিগত ছাত্র আন্দোলনে ঢাকার রাজপথে খুনের নেশায় মেতে উঠেছিল এই নরপিশাচ। আর বর্তমানেও সমস্ত অপরাধ আড়াল করে সে বাগিয়ে নিয়েছে রংপুর রেঞ্জের পুলিশ সুপার (অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অ্যান্ড ফিন্যান্স)-এর মতো প্রভাবশালী ও দোর্দণ্ড প্রতাপশালী চেয়ার!
প্রায় অর্ধ কোটি টাকা আত্মসাৎ, ফিল্মি কায়দায় গুমের চেষ্টা ও ৪৫ মিনিটে ৫ মামলা!
অনুসন্ধানে ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে জমা পড়া নথির সূত্রে জানা যায়, ২০১১ সালে মৌলভীবাজারের তৎকালীন সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার থাকাকালে আলমগীর হোসেন ও তার ঘনিষ্ঠ বান্ধবী ডা: রাজিয়া সুলতানা মিলে জে পি এল ডোর এন্ড ফার্নিচার ইন্ডাস্ট্রিজ ও জালালাবাদ প্রোডাক্টস লিঃ এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো: সাইফুল ইসলাম সজীবের সাথে সখ্যতা গড়ে তোলেন। এরপর ব্যবসা সম্প্রসারণের লোন, বাকিতে দামি ফার্নিচার ও গাড়ি কেনা বাবদ ব্যবসায়ী সজীবের কাছ থেকে প্রায় অর্ধ কোটি টাকা সুকৌশলে হাতিয়ে নেন আলমগীর।
পরবর্তীতে সজীব নিজের পাওনা টাকা ফেরত চাইতেই হিংস্র বাঘের মতো গর্জে ওঠে এই উর্দিধারী ডাকাত। পাওনাদারকে চিরতরে স্তব্ধ করে দিতে ২০১২ সালের ৭ আগস্ট ব্যবসায়ী সজীবকে ঢাকার তার বাসা থেকে ফিল্মি কায়দায় অপহরণ করে গুম করার উদ্দেশ্যে তুলে নিয়ে যায় আলমগীর ও তার বাহিনী। কিন্তু স্থানীয় জনতা ও উপস্থিত মিডিয়াকর্মীদের তীব্র প্রতিরোধের মুখে গুমের মিশন ব্যর্থ হলে তাকে সরাসরি মৌলভীবাজার মডেল থানায় নিয়ে আসা হয়। সেখানে মাত্র ৪৫ মিনিটের ব্যবধানে সজীবের বিরুদ্ধে পর্যায়ক্রমে ৫টি সম্পূর্ণ সাজানো, বানোয়াট ও মিথ্যা মামলা ঠুকে দেয় এই জালিয়াত পুলিশ কর্মকর্তা।
এই পৈশাচিক ষড়যন্ত্রের পেছনে সরাসরি যুক্ত ছিলেন তৎকালীন ফ্যাসিবাদী সরকারের চিফ হুইপ ও সাবেক কৃষিমন্ত্রী উপাধ্যক্ষ আব্দুস শহীদ এবং তার ছোট ভাই মোসাদ্দেক হোসেন মানিক। আলমগীর তার খালাতো ভাই সোহেল রানা, বান্ধবী ডা: রাজিয়া সুলতানা এবং নিজের বডিগার্ড নাজিম উদ্দিনকে বাদী বানিয়ে এই মিথ্যা মামলাগুলো করায়। এরপর ব্যবসায়ী সজীবকে জেলে পুরে দিনের পর দিন চালানো হয় অমানুষিক ও অর্বাচীন নির্যাতন। ধ্বংস করে দেওয়া হয় তার শত শত শ্রমিকের রুটি-রুজির কর্মস্থল ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান।
চূড়ান্ত বরখাস্তের আদেশ ডাস্টবিনে ফেলে প্রমোশনের মহোৎসব!
এই পৈশাচিক জুলুমের প্রতিকার চেয়ে ব্যবসায়ী সাইফুল ইসলাম সজীব ২০১২ সালের ২৮ নভেম্বর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সদর দপ্তরে আলাদা দুটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। পুলিশের দীর্ঘ ও নিবিড় তদন্তে আলমগীরের বিরুদ্ধে আনা প্রতিটি পৈশাচিকতার সত্যতা প্রমাণিত হয়। এর প্রেক্ষিতে ২০১৫ সালের ১৬ এপ্রিল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপীল) বিধিমালা অনুযায়ী তাকে “চাকুরী হতে বরখাস্ত” (Dismissal from service) করার গুরুদণ্ড প্রদান পূর্বক পিএসসির চূড়ান্ত মতামত চায়। একই বছরের ২১ অক্টোবর পাবলিক সার্ভিস কমিশনও (PSC) তাকে সরকারি চাকরি থেকে চিরতরে বরখাস্ত করার সপক্ষে চূড়ান্ত সিলমোহর দেয়।
দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি করা এই চূড়ান্ত বরখাস্তের আদেশকে স্রেফ বুড়ো আঙুল দেখিয়ে, ক্ষমতার দাপটে পার পেয়ে যান আলমগীর। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এবং ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমানের ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে সকল নিয়ম ও তদন্তকে ডাস্টবিনে নিক্ষেপ করে তাকে আবার চাকরিতে পুনর্বহাল করা হয়। এই খুনের লাইসেন্স ও জোড়া প্রমোশন ব্যবহার করেই ২০২৪-এর ছাত্র আন্দোলনে ঢাকার রাজপথে সাধারণ ছাত্র-জনতার রক্তে হোলি খেলায় মেতে ওঠে এই নরঘাতক।
থানার ভেতর ধর্ষণ ও কলম দিয়ে চোখ উপড়ে ফেলার পৈশাচিকতা!
আলমগীরের অপরাধের খতিয়ান কোনো সাধারণ মানুষের কল্পনাকেও হার মানায়। মৌলভীবাজারের কুলাউড়া সার্কেলের দায়িত্বে থাকাকালীন খোদ থানার ভেতরেই এক অসহায় নারীকে ধর্ষণের মতো জঘন্য ও চরম ন্যাক্কারজনক অপরাধে লিপ্ত হন এই পুলিশ কর্মকর্তা। পরবর্তীতে এই মহাধর্ষণকাণ্ড ধামাচাপা দিতে ওই ধর্ষিতা নারীর স্বামী লিটন হাসান ইমনকে উল্টো মিথ্যা ও ষড়যন্ত্রমূলক মামলায় ফাঁসিয়ে জেলহাজতে প্রেরণ করে এই লম্পট। এছাড়াও নিরীহ মানুষকে থানায় আটকে রেখে জিজ্ঞাসাবাদের নামে চোখ কলম দিয়ে খুঁচিয়ে অন্ধ করে দেওয়ার মতো একাধিক মধ্যযুগীয় ও লোমহর্ষক বর্বরতার অভিযোগ রয়েছে এই জল্লাদের বিরুদ্ধে।
বর্তমান অবস্থান: রংপুর রেঞ্জের দোর্দণ্ড প্রতাপশালী ‘এসপি অ্যাডমিন’
বিভাগীয় তদন্ত, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং পাবলিক সার্ভিস কমিশনের চূড়ান্ত রায়ে চাকরিচ্যুত হওয়ার পর এবং ছাত্র-জনতা হত্যার সরাসরি সম্পৃক্ততা থাকার পরও এই নরপিশাচ আলমগীর হোসেন (বিপি নং-৭৯০৬১১১১৪৩) বর্তমানে বহাল তবিয়তে রংপুর রেঞ্জ ডিআইজি কার্যালয়ে পুলিশ সুপার (অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অ্যান্ড ফিন্যান্স) হিসেবে বহাল থেকে বীরদর্পে রাজত্ব চালিয়ে যাচ্ছেন!
বিভাগীয় তদন্তে অপরাধের পাহাড় প্রমাণিত হওয়ার পরও কীভাবে এমন এক প্রমাণিত ধর্ষক, খুনি, অপহরণকারী ও চাঁদাবাজ পুলিশ কর্মকর্তা বহাল তবিয়তে প্রমোশন পেয়ে পুলিশের প্রশাসন ও অর্থ বিভাগের মতো সর্বোচ্চ গুরুত্বপূর্ণ পদ ভাগিয়ে দাপট দেখায়— তা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ ও ক্ষোভের আগুনে ফুঁসছে দেশের আমলারা ও সাধারণ মানুষ। এই নরপিশাচ আলমগীর এবং তার সহযোগী ১ ওসি ও ৪ এসআই-সহ অপরাধী চক্রকে অনতিবিলম্বে গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি জানিয়েছে ভুক্তভোগী পরিবার এবং দেশের আপামর ছাত্র-জনতা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে তদন্তকারী কর্মকর্তা সিলেট রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি নাসির উদ্দিন আহমেদ ‘প্রতিবেদক’কে স্পষ্টভাবে জানান-
“এই অতি গুরুতর অভিযোগের তদন্তভার আমার ওপর অর্পণ করা হয়েছিল। আমি অত্যন্ত নিখুঁত ও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত সম্পন্ন করে সমস্ত অপরাধের অকাট্য প্রমাণসহ চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন পুলিশ সদর দপ্তর শৃঙ্খলা শাখায় পাঠিয়ে দিয়েছি।”
এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশনস)-এর আনুষ্ঠানিক বক্তব্য জানার জন্য একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এই জল্লাদের আরও ভয়ঙ্কর সব কীর্তি নিয়ে চোখ রাখুন আগামী সংখ্যায়… (চলবে..