অষ্টগ্রামে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক তালিকায় স্বজনপ্রীতির অভিযোগ: অনিয়মের সত্যতা স্বীকার করলেন এমপি ফজলুর রহমান

মোঃ আল-আমিন, বিশেষ প্রতিনিধি: কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম উপজেলায় হাওরের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রণয়নে স্বজনপ্রীতি ও অনিয়মের অভিযোগের সত্যতা স্বীকার করেছেন কিশোরগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও বীর মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান।

 

‎শনিবার (১৩ জুন) অষ্টগ্রাম সরকারি রটারি ডিগ্রি কলেজের বার্ষিক ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকায় স্বজনপ্রীতি হয়েছে—এটি সত্য। কেউ যদি তথ্য-প্রমাণ দিতে পারেন, তাহলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

‎তিনি আরও বলেন, যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে তালিকায় অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে অযোগ্য ব্যক্তিদের নাম বাদ দেওয়া হবে।

‎অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অ্যাডভোকেট উম্মে কুলসুম রেখা, অষ্টগ্রাম থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. রোকনুজ্জামান, সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সৈয়দ ফাইয়াজ হাসান বাবু, উপজেলা বিএনপির সভাপতি সৈয়দ সাইয়াদ আহমেদসহ স্থানীয় রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতৃবৃন্দ। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন অষ্টগ্রাম সরকারি রটারি ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ মোস্তফা আরিফ খান।

‎সরকার হাওরাঞ্চলের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহায়তা প্রদানের উদ্যোগ গ্রহণ করার পর কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম উপজেলায় প্রস্তুত করা ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনা শুরু হয়।

‎উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার আটটি ইউনিয়নে মোট ৬ হাজার ৪ জন কৃষককে ক্ষতিগ্রস্ত হিসেবে চূড়ান্ত তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। তবে তালিকা প্রকাশের পর বিভিন্ন ইউনিয়ন থেকে অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি এবং প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের বাদ দেওয়ার অভিযোগ উঠে।

‎স্থানীয়দের অভিযোগ অনুযায়ী, তালিকায় এমন কিছু ব্যক্তির নাম রয়েছে যারা দীর্ঘদিন আগে মারা গেছেন কিংবা দীর্ঘ সময় ধরে প্রবাসে অবস্থান করছেন।

‎অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, বাঙালপাড়া ইউনিয়নের উসমানপুর গ্রামের মৃত ইসহাক মিয়ার নাম তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। একইভাবে দেওঘর ইউনিয়নের আলীনগর গ্রামের অলি মিয়া এবং দেওঘর গ্রামের সোহেল আহমেদের নামও তালিকায় রয়েছে, যদিও স্থানীয়দের দাবি তারা দীর্ঘদিন ধরে প্রবাসে রয়েছেন।

‎এছাড়াও এমন অনেক ব্যক্তির নাম তালিকাভুক্ত করা হয়েছে যাদের নিজস্ব কৃষিজমি নেই কিংবা তারা কৃষিকাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত নন বলে অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত অনেক কৃষক তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন বলে দাবি স্থানীয়দের।

‎সরেজমিনে কলমা ইউনিয়নের সাপান্ত, বাজরী, কাকুরিয়া ও জেলে পল্লী এলাকায় গিয়ে কয়েকজন ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আকস্মিক বন্যা ও হাওরের পানিতে তাদের ব্যাপক ফসলহানি হয়েছে।

‎সাপান্ত গ্রামের কৃষক জহরলাল দাস বলেন,

‎৫০ ক্ষের জমিতে ধান আবাদ করেছিলাম। সব পানির নিচে তলিয়ে গেছে। ধান কাটতে পারিনি। সরকার ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা করছে শুনেছি, কিন্তু সেখানে আমার নাম নেই।

‎কাকুরিয়া গ্রামের কৃষক অনিল দাস বলেন,

‎৩০ ক্ষের জমির ধান নষ্ট হয়েছে। এখন খুব কষ্টে দিন কাটছে। অথচ ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকায় আমার নাম নেই।

‎একই গ্রামের কৃষক পরিমল দাস বলেন,

‎২০ ক্ষের জমির ধান পানিতে নষ্ট হয়েছে। ধান ঘরে তুলতে পারিনি। কিন্তু কোনো সহায়তার তালিকায় আমার নাম অন্তর্ভুক্ত হয়নি।

‎স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রভাবশালী মহলের সুপারিশে অযোগ্য ব্যক্তিদের নাম তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। এমনকি একই পরিবারের একাধিক সদস্যের নামও তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে।

‎এ ধরনের অভিযোগের ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে হতাশা বাড়ছে। প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা তাদের প্রাপ্য সহায়তা থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা করছেন।

‎স্থানীয় সচেতন মহল ও ভুক্তভোগী কৃষকদের দাবি, দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা পুনঃযাচাই করতে হবে। পাশাপাশি অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের অনিয়ম আর না ঘটে।

‎তাদের মতে, সরকারের সহায়তা প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের কাছে পৌঁছালে শুধু কৃষকরাই উপকৃত হবেন না, বরং সরকারের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা আরও সুদৃঢ় হবে।

‎তালিকা নিয়ে বিতর্কের বিষয়ে জানতে চাইলে অষ্টগ্রাম সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সৈয়দ ফাইয়াজ হাসান বাবু বলেন, কৃষকের সংখ্যা কমানো-বাড়ানো নিয়ে দফায় দফায় সংযোজন-বিয়োজন করতে গিয়ে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের নাম তালিকাভুক্ত করার ক্ষেত্রে কিছু ভুলভ্রান্তি হয়েছে। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট নেতৃবৃন্দের আরও সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত ছিল।

‎তিনি আরও বলেন, আমি শুরুতেই প্রশাসনের কাছে একটি প্রস্তাব দিয়েছিলাম যে, হাওরাঞ্চলের প্রতিটি সেচ প্রকল্পের (স্কিম) ম্যানেজারদের কাছে প্রকৃত কৃষকদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা রয়েছে। সেখানে কৃষকের নাম-ঠিকানাসহ কে কতটুকু জমি আবাদ করেছেন এবং কারা বর্গাচাষি—এসব তথ্য নির্ভুলভাবে সংরক্ষিত আছে। সেই তালিকার ভিত্তিতে তদন্ত করে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের নাম প্রস্তুত করা হলে মৃত, প্রবাসী কিংবা অকৃষকদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার কোনো সুযোগ থাকত না। কারণ হাওরাঞ্চলের প্রায় ৮০ শতাংশ কৃষক বিভিন্ন সেচ প্রকল্পের আওতায় এবং বাকি ২০ শতাংশ কৃষক ব্যক্তিগত সেচ ব্যবস্থার আওতায় অথবা সেচ প্রকল্পের বাইরে চাষাবাদ করে থাকেন।

‎প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকাভুক্ত করার আহ্বান জানিয়ে চেয়ারম্যান বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা যথাযথভাবে বাস্তবায়নের স্বার্থে দ্রুত প্রশাসনিক তদন্তের মাধ্যমে বাদ পড়া প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি অনুরোধ জানাচ্ছি।

‎এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে অষ্টগ্রাম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সিলভিয়া স্নিগ্ধার সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার ফোনে সাড়া পাওয়া যায়নি। স্থানীয় সাংবাদিকদের অভিযোগ, তিনি সাধারণত সাংবাদিকদের ফোনকল গ্রহণ করেন না। কখনও যোগাযোগ স্থাপিত হলেও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া মন্তব্য করা সম্ভব নয় বলে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যান। তবে এ বিষয়ে তার কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

নিউজটি আপনার স্যোসাল নেটওয়ার্কে শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Many players prefer ultra casino because of its balance between functionality and simplicity. Avoiding overly complex menus helps users stay focused on games. This is particularly important for mobile casino players using smaller screens.