

কামরুল ইসলাম,রাঙ্গুনিয়া (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধিঃ
চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার কাপ্তাই সড়কের গোচরা বিএম স্কয়ার এলাকায় রাস্তার মাটি কাটা ও বিক্রিকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ, হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও পাল্টাপাল্টি মামলার ঘটনায় এলাকায় চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। ঘটনাকে কেন্দ্র করে উভয় পক্ষ একে অপরের বিরুদ্ধে হামলা, চাঁদাবাজি, লুটপাট, গুরুতর আহত করা ও প্রাণনাশের হুমকির অভিযোগ এনে রাঙ্গুনিয়া মডেল থানায় পৃথক দুটি মামলা দায়ের করেছে।
পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে আলামত সংগ্রহ করেছে এবং ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদঘাটনে তদন্ত শুরু করেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ৩০ জুলাই সকালে গোচরা বিএম স্কয়ারের বিপরীত পাশে কাপ্তাই সড়ক সম্প্রসারণ কাজের অংশ হিসেবে স্ক্যাভেটর দিয়ে মাটি কাটা শুরু হয়। এ সময় স্থানীয় আজিমনগর এলাকার একদল ব্যক্তি মাটি বিক্রির বিরোধিতা করে কাজ বন্ধ করে দেন। তাদের দাবি ছিল, রাস্তা থেকে উত্তোলিত মাটি বিক্রি না করে সড়কের পাশেই সংরক্ষণ করতে হবে। এ বিষয় নিয়ে পূর্ব থেকেই মাটি বিক্রির সঙ্গে জড়িতদের সঙ্গে মতবিরোধ চলছিল।
প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, এ সময় উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক আশরাফুল হক হারুন ও পোমরা ইউনিয়ন যুবদলের আহ্বায়ক ওমর ফারুকের সঙ্গে স্থানীয়দের কথা-কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে তা হাতাহাতিতে রূপ নেয়। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে দিনভর মাটি কাটার কাজ বন্ধ রাখা হয়।
পরদিন ৩১ জুলাই পুনরায় মাটি কাটার উদ্যোগ নেওয়া হলে আবারও উভয় পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দেয়। অভিযোগ রয়েছে, রাতের দিকে দায়িত্বে থাকা সাপলেজা পাড়ার মৃত এবাদুর রহমানের ছেলে মোহাম্মদ সোলাইমান (৪২) প্রতিপক্ষের হামলায় মাথায় গুরুতর আঘাতপ্রাপ্ত হন। স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করেন।
আহত হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। অভিযোগ অনুযায়ী, সোলাইমানের সমর্থকরা সংঘবদ্ধ হয়ে চট্টগ্রাম উত্তর জেলা তরুণদলের সাবেক সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক সাইফুল ইসলাম তালুকদারের বাড়িতে হামলা চালায়। এ সময় বাড়িতে ব্যাপক ভাঙচুর করা হয় এবং সেখানে থাকা দুটি মোটরসাইকেলে আগুন দেওয়া হয়। এছাড়া কয়েক রাউন্ড গুলিবর্ষণের ঘটনাও ঘটে বলে স্থানীয়দের দাবি।
সাইফুল ইসলাম তালুকদার জানান, হামলার সময় তিনি প্রাণ বাঁচাতে বাড়ি থেকে বের হয়ে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করেন। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুনে পুড়ে যাওয়া মোটরসাইকেল এবং দুটি গুলির খোসা উদ্ধার করে। ঘটনার পর এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়।
এ ঘটনায় সাইফুল ইসলাম তালুকদারের স্ত্রী তানজু আক্তার (২৩) বাদী হয়ে ২ই আগস্ট ১৬ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা আরও ৭-৮ জনকে আসামি করে মামলা দায়ের করেন। মামলার এজাহারে বলা হয়, সংঘবদ্ধভাবে তাদের বসতবাড়িতে হামলা চালিয়ে দরজা ভেঙে প্রবেশ করা হয়। তাকে মারধর করা হয়, ঘরের আসবাবপত্র ভাঙচুর করা হয় এবং তার স্বামীর ব্যবহৃত Yamaha R15M মোটরসাইকেলে আগুন দেওয়া হয়। এছাড়া আলমারি থেকে প্রায় দেড় ভরি স্বর্ণালঙ্কার ও নগদ দুই লাখ টাকা লুট করে নেওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে। এজাহারে আরও উল্লেখ করা হয়, ব্যবসায়িক লেনদেনের প্রায় ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা পাওনাকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে তাদের বিভিন্নভাবে হুমকি দেওয়া হচ্ছিল।
অন্যদিকে, আহত মোহাম্মদ সোলাইমান বাদী হয়ে ৩ই আগস্ট রাঙ্গুনিয়া মডেল থানায় সাইফুল ইসলাম তালুকদারসহ পাঁচজনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা আরও ৭-৮ জনকে আসামি করে পৃথক মামলা দায়ের করেন। মামলায় অভিযোগ করা হয়, কাপ্তাই সড়কের আজিমনগর বিএম স্কয়ার কমিউনিটি সেন্টারের সামনে মাটি বিক্রিকে কেন্দ্র করে বিবাদের একপর্যায়ে অভিযুক্তরা সংঘবদ্ধ হয়ে তার কাছে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাকে দেশীয় অস্ত্র ও লোহার রড দিয়ে মারধর করে গুরুতর আহত করা হয় এবং হত্যার হুমকি দেওয়া হয়।
সোলাইমান দাবি করেন, ৩১ জুলাই রাত আনুমানিক ১০টার দিকে ইউছুফ, মানিক, মামুনসহ ১০-১৫ জনের একটি দল তার ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। তাদের হামলায় মাথায় গুরুতর আঘাত পেয়ে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। পরে স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সোলাইমান যুবদলের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত।
এদিকে সাইফুল ইসলাম তালুকদার অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, কাপ্তাই সড়কের মাটি কাটা বা বিক্রির সঙ্গে তার কোনো ধরনের সম্পৃক্ততা নেই। ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসার জের ধরে তার বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট চালানো হয়েছে। একই সঙ্গে তাকে ও তার ভাইকে একটি মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলায় আসামি করা হয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন।
রাঙ্গুনিয়া মডেল থানা সূত্রে জানা গেছে, উভয় পক্ষের লিখিত অভিযোগ গ্রহণ করা হয়েছে। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করেছে এবং ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটনে তদন্ত চলছে। তদন্তে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
এদিকে, তানজু আক্তারের দায়ের করা মামলায় আশরাফুল হক হারুনসহ আটজন ৪ আগস্ট আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন আবেদন করলে বিজ্ঞ আদালত তাদের জামিন মঞ্জুর করেন।
ঘটনার পর থেকে গোচরা বিএম স্কয়ার ও আশপাশের এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি ও সচেতন নাগরিকরা সড়কের মাটি বিক্রি বন্ধ করে তা রাস্তার পাশেই সংরক্ষণের দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, বিষয়টির দ্রুত ও স্থায়ী সমাধান না হলে ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের সংঘর্ষের আশঙ্কা রয়েছে।