কুঁড়ে ঘরে চলছে চিকিৎসা, ৩ যুগ ধরে ধ্বংসস্তূপে স্বাস্থ্যকেন্দ্র

কামরুল ইসলাম,রাঙ্গুনিয়া প্রতিনিধি:
চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার পোমরা ইউনিয়নের বাচাশাহ নগরে অবস্থিত কমিউনিটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি দীর্ঘ ৩৫ বছর ধরে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থেকে এখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। ১৯৯১ সালের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ে ভবনটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর থেকে অদ্যাবধি সংস্কার বা নতুন ভবন নির্মাণের কোনো কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করেনি স্থানীয় প্রশাসন। বর্তমানে পোমরা ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ড এবং রাঙ্গুনিয়া পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডের পাঁচ হাজারেরও বেশি মানুষ চিকিৎসার জন্য পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত একটি জরাজীর্ণ ও স্যাঁতসেঁতে ছোট কক্ষে যাতায়াত করতে বাধ্য হচ্ছেন। বিদ্যুৎ সংযোগহীন এই কক্ষটিতে নেই জরুরি শৌচাগার, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম বা আসবাবপত্র, যেখানে একটিমাত্র টেবিল ও চেয়ারের ওপর ভর করে চলছে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবা। পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত হওয়ার কারণে বর্ষাকালে এই স্থানটি চলাচলের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে, যা সাধারণ মানুষের চিকিৎসাপ্রাপ্তির মৌলিক অধিকারকে চরমভাবে ব্যাহত করছে।

ভুক্তভোগী স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, কমিউনিটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির এই বেহাল দশা তাদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা নুরুল আলমের ভাষ্যমতে, জেলেপাড়ার দরিদ্র মানুষসহ নদীর ওপারের বাসিন্দারা এই কেন্দ্রের ওপর নির্ভরশীল হলেও পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধার অভাবে অনেকেই চিকিৎসা নিতে এসে হতাশ হয়ে ফিরে যান। পাহাড়ের ওপর অবস্থিত হওয়ার কারণে বর্ষায় সাপ ও পোকামাকড়ের ভয় এবং চলাচলের দুর্গমতা স্থানীয়দের জন্য নিত্যদিনের আতঙ্ক। ইসমাইল নামের আরেক বাসিন্দা জানান, সপ্তাহে মাত্র দুই দিন চিকিৎসক এলেও রোগী ও চিকিৎসকদের ব্যবহারের জন্য কোনো শৌচাগার বা বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা সেখানে নেই। ফলে ন্যূনতম স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ ছাড়াই রোগীদের চিকিৎসা নিতে হচ্ছে, যা মূলত সরকারি স্বাস্থ্যসেবা খাতের অব্যবস্থাপনা ও স্থানীয় পর্যায়ের চরম উদাসীনতাকে নির্দেশ করে।

সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্বহীনতা এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে। রাঙ্গুনিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের প্রধান চিকিৎসক জয়নাব জমিলা বিষয়টি সম্পর্কে অবগত থাকলেও এর বর্তমান অবস্থা বা স্থায়ী সমাধানের বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা বা জবাব দিতে ব্যর্থ হয়েছেন।

এমনকি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সহকারী দেবাশীষ বড়ুয়ার কাছে এ বিষয়ে নথিপত্রসহ তথ্য চাওয়া হলে তিনি এক সপ্তাহ পেরিয়ে যাওয়ার পরও কোনো প্রকার অগ্রগতি বা সমাধান দিতে পারেননি। এদিকে, গত ২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সালে জেলা পরিষদের প্রকাশিত একটি দরপত্রে ওই স্বাস্থ্যকেন্দ্রের পাশের জায়গাটিকে ‘পোমরা পোল্ট্রি ফার্ম’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, যা জায়গাটির মালিকানা ও ব্যবহারের বৈধতা নিয়ে জনমনে গভীর সন্দেহের সৃষ্টি করেছে। রাজনৈতিক প্রভাবে অতীতে জায়গাটি দখলের অপচেষ্টা ও বর্তমান প্রশাসনিক স্থবিরতা স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির পুনর্নির্মাণের পথকে রুদ্ধ করে রেখেছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।

পরিত্যক্ত স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির জমি সংক্রান্ত জটিলতা নিরসন এবং আধুনিক ভবন নির্মাণ এখন সময়ের দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে। দীর্ঘ ৩৫ বছর ধরে একটি জনগুরুত্বপূর্ণ সেবা কেন্দ্রকে ভূতুড়ে ঘরে রূপান্তর করে রাখার বিষয়টি সরকারি স্বাস্থ্য খাতের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অভাবকেই স্পষ্ট করে তোলে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে বিদ্যুৎ, নিরাপদ পানি, শৌচাগার এবং পর্যাপ্ত চিকিৎসা সরঞ্জাম নিশ্চিত না করলে এই অঞ্চলের পাঁচ হাজার মানুষ স্থায়ীভাবে চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকবে।

স্থানীয় জনগণের দাবি অনুযায়ী, অবিলম্বে মালিকানা জটিলতা দূর করে আধুনিক ভবন নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ না করলে রাঙ্গুনিয়ার প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে, যার দায়ভার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকেই বহন করতে হবে।

নিউজটি আপনার স্যোসাল নেটওয়ার্কে শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Many players prefer ultra casino because of its balance between functionality and simplicity. Avoiding overly complex menus helps users stay focused on games. This is particularly important for mobile casino players using smaller screens.